জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিতে নতুন চাপ: অর্থনীতিতে গভীর সংকটের শঙ্কা
দেশের মানুষ আজ বড় সংকটের মাঝে নিপতিত। বলতে গেলে পুরো দেশই এক গভীর সংকটে পড়েছে বা পড়তে যাচ্ছে। শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আর এ মাধ্যমে এবার দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছোল।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা,কেরোসিন ১৩০ টাকা,অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম এর মধ্যেবি কার্যকর হয়েছে। অথচ সরকার বলেছিল এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না। তাই এখন প্রশ্ন এই দাম সরকার বাড়ালো নাকি আইএমএফ বাড়ালো? কিংবা এই দাম বাড়ানোর মাধ্যমে কি পেট্রোল পাম্পের সামনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন কমবে?
ঋণের কিস্তি পাওয়ার জন্য আইএমএফ-এর সাথে সরকারের আলোচনা চলছে। আইএমএফ-এর প্রধান তিনটি শর্তের একটি হলো জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি কমাতে হবে। সেই শর্ত মেনেই সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এখন বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে জিনিসপত্রের দামে,যার জন্য চরম ভুগতে হবে সাধারণ মানুষকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর-বিবিএস- তথ্য অনুযায়ী এখন মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি বাড়ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি-কে আরেক দফা চড়িয়ে দিবে বলে শংকা করা হচ্ছে।
মানুষের আয় কমে যাওয়ায় বেড়ে গেছে দারিদ্র্যের হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো -বিবিএস-এর সর্বশেষ জরিপ করেছিল ২০২২ সালে,তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী,বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১ দশমিক ২ শতাংশ,এই হিসাবে এখন দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।
দারিদ্র্য হারের এই পতন ঠেকাতে হলে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। কিন্তু সেই সুযোগ খুবই সীমিত। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় আরও কমে যাবে। বাড়বে দারিদ্র্য।
বাড়বে পরিবহন খরচ। বাড়বে কৃষির খরচও। জমিতে সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে ধান কাটা,মাড়াই,পরিবহন ও বাজারজাত-সবকিছুতেই ডিজেল অপরিহার্য। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচ ও ফসল ঘরে তোলার ওপর। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই বোরো। সেই বুরো আবাদই সংকটে পড়তে যাচ্ছে্।
সরকার এখন বিদ্যুতের দাম বাড়াবে। আর এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবন আরও সংকটে পড়বে। গ্যাস সংযোগের কারণে কারখানা চালু না করতে পারার পাশাপাশি এখন ডিজেলের অভাবে জেনারেটর চালাতে প্রয়োজনীয় ডিজেলও পাচ্ছে না কারখানাগুলো। সাথে আছে বয়াবহ লোডশেডিং। এর মধ্যেই পোশাক খাত থেকে সতর্ক বার্তা আসছে।
এই মুহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একসঙ্গে কয়েকটি চাপ সামাল দেওয়া-মূল্যস্ফীতি কমানো,কর্মসংস্থান বাড়ানো,বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো,ব্যাংক খাত সংস্কার করা এবং জ্বালানি খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। এর কোনটিই ঠিকভাবে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।
সাধারণ মানুষকে বেশি অভিঘাত দিচ্ছে দ্রব্যমূল্য। মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে,ব্যয় তার চেয়ে বেশি বাড়ছে। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমছে,বাজারে চাহিদা দুর্বল হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়া যে কোথায় নিয়ে যাবে পরিস্থিতি কে জানে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি,কমে যাওয়া বাস্তব আয় এবং দুর্বল কর্মসংস্থানের কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আবার বাড়ছে। ফলে বাড়ছে বৈষম্য। দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এর মানে,প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
বাড়ছে বেকারত্ব। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে,২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছেছেন;কিন্তু এ সময় চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। আবার ২০২৩ সালে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৮ শতাংশ;আর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে ছিল ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে পর্যাপ্ত কাজ তৈরি হচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট ও অব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে,টাকার ওপর চাপ বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতি তো বাড়বেই। একই সঙ্গে রপ্তানি,প্রবাসী আয়,ভর্তুকি ব্যয় এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি-সব ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। সময় এখন সরকার ও জনগণ উভয়ের জন্যই খারাপ।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়-এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া প্রকৃত আয়, বাড়তি উৎপাদন খরচ, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বগতি-সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া, যাতে একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। সময়োপযোগী পদক্ষেপ, সুশাসন এবং কার্যকর সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
Comments