বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে নতুন ঝড়
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরেই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড়ো ঘাটতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি-এই চারটি চাপ এখন অর্থনীতির ওপর একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যেই আবার নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয়, তবে ইতিমধ্যে নড়বড়ে হয়ে পড়া অর্থনীতির জন্য সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রায় নয় মাস পর আবার মূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের ঘরে ফিরে এসেছে। এর অর্থ হলো, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ আবার তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়ানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চালের দাম কিছুটা কমলেও মাছ, সবজি ও ফলের দাম বাড়ার কারণে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমেনি; বরং ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। কারণ, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়ছে না। বর্তমানে মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এর ফলে বাস্তবে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় "প্রকৃত আয় কমে যাওয়া",অর্থাৎ কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও সেই আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সামাজিক অস্থিরতার কারণও হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জানুয়ারি মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। রাজস্ব আদায়ে এমন ঘাটতি থাকলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সরকারকে হয় ঋণ নিতে হয়, নয়তো উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয়। দুই ক্ষেত্রেই অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি কমে যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নীতি অনুসরণ করছেন। নতুন শিল্প স্থাপন বা বড়ো বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অনেকেই স্থগিত রাখছেন। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে যাচ্ছে এবং অর্থনীতির গতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই সব অভ্যন্তরীণ সমস্যার মধ্যেই এখন সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি বড়ো ঝুঁকি-মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। যদি ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর। ফলে প্রায় সব পণ্যের দামই বাড়তে শুরু করে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট খুব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। জ্বালানি আমদানির বিল বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অতীতে আমরা দেখেছি, এমন পরিস্থিতিতে টাকার মান কমে যায় এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় অর্থনীতির সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ-একদিকে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষার সময়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো-সবগুলো ক্ষেত্রেই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা কমাতে কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার এনে করজাল বিস্তৃত করতে হবে,যাতে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি কমানো যায়।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতি স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর চতুর্থত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জ্বালানি ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে সংকটের সময়ই সঠিক নীতি ও নেতৃত্বের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি সমস্যাগুলোকে অবহেলা করা হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে এই সংকটকে সামাল দেওয়া গেলে ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করলে অর্থনীতিকে সামনের দিনগুলোতে আরও বড় ঝড়ের মুখোমুখি হতে পারে।
Comments