ইমরান খানের চোখের অসুস্থতা ঘিরে বদলে গেল রাজনৈতিক আবহ
কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যখন প্রকাশ করেন যে তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির ১৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে, তখন তা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। এর আগে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর অনেক নেতাকর্মী দীর্ঘ কারাবাসের বাস্তবতা মেনে নিয়ে নীরব প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আইনি পরিসর ছিল সংকুচিত, রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল প্রতিকূল, এবং দ্রুত মুক্তির সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ।সমর্থকদের মধ্যেও ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার মানসিক প্রস্তুতি।
কিন্তু সাত পৃষ্ঠার একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কারাগারে পিটিআই প্রতিষ্ঠাতার শারীরিক অবস্থার বর্ণনা, যদিও ভাষায় ছিল ক্লিনিক্যাল, রাজনৈতিকভাবে তা হয়ে ওঠে বিস্ফোরক। আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই হঠাৎ করেই মানবিক ও স্বাস্থ্যগত ইস্যুতে রূপ নেয়।ডান চোখের আংশিক দৃষ্টিহানি দলীয় সীমা ছাড়িয়ে সহানুভূতির সাড়া তোলে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আর শুধু আদালতের কারিগরি বিষয় বা নির্বাচনী অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং উঠে আসে নৈতিক দায়িত্ব ও জরুরি চিকিৎসার প্রশ্ন।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পিটিআইয়ের তৃণমূল কর্মীরা নতুন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগের ঝড় ওঠে, এমনকি কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটারও খানের চিকিৎসাজনিত মুক্তির দাবি জানান। যা একসময় অসম্ভব মনে হচ্ছিল—মুক্তির সম্ভাবনা—তা কিছুটা বাস্তবসম্মত বলে মনে হতে শুরু করে। খানের আইনজীবীরা ইসলামাবাদ হাইকোর্টে তোশাখানা মামলায় তাঁর সাজা স্থগিতের আবেদন করেছেন, যেখানে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত স্বাধীন মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছে।
এরপরই শুরু হয় জল্পনা। এটি কি শুধুই চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ, নাকি বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক কৌশলের সূচনা?পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কাকতালীয় নয়। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীকে কারাগারে খানের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।
এছাড়া রিপোর্টে খানের সংযত ভাষা, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ না আনা এবং পিটিআই নেতাদের সতর্ক সুরও আলোচনায় এসেছে। এমনকি খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রীও কর্মীদের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারি মন্ত্রীরাও পূর্ণ চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরীফের ঘটনার সঙ্গে মিল খুঁজছেন। দণ্ডিত অবস্থায় কারাবন্দি থাকার পর তিনি চিকিৎসাজনিত কারণে অবশেষে মুক্তি পান এবং বিদেশে যান।
বিশ্লেষক আহমেদ বিলাল মেহবুব বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে বেসামরিক সরকার ও প্রভাবশালী মহলের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত নরম কৌশলই কার্যকর হয়। তাঁর মতে, রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে মুখোমুখি সংঘাতের বদলে নিরাপদ পথ বেছে নিতে হয়।
তবে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাজহার আব্বাস মনে করেন, খানের বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, "খান বরাবরই দেশে থেকে লড়াইয়ের রাজনীতি করেছেন। চিকিৎসার অজুহাতে বিদেশে গেলে তাঁর সমর্থকেরা তা মেনে নাও নিতে পারেন।" বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ধরনের সমঝোতা করলে রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। কারণ খানের রাজনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে আপসহীন থাকার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
সব মিলিয়ে, ইমরান খানের চোখের অসুস্থতার প্রকাশ শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
Comments