বাংলাদেশের ‘সোয়া এক কোটি’ হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকার আহ্বান আরএসএস প্রধানের
ভারতের হিন্দু পুনরুত্থানবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত বাংলাদেশের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে 'লড়াই' করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হিন্দুরা তাদের সমর্থন দেবে।
মুম্বাইয়ে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আরএসএসের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের হিন্দুরা এবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশ ছাড়বে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।'
আরএসএসের শতবর্ষ উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তৃতার পর শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ মন্তব্য করেন। এর আগেও বাংলাদেশের হিন্দুদের বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। গত ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় এক সেমিনারেও তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
মোহন ভাগবত বলেন, 'বাংলাদেশে এখনো সোয়া এক কোটি হিন্দু রয়েছেন। তারা যদি একজোট হন, তাহলে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে রাজনৈতিক পরিসর ব্যবহার করতে পারবেন।' তিনি আরও বলেন, 'খুশির বিষয় হলো—তারা পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। ওখানেই থাকবে এবং লড়াই করবে। লড়াইয়ের জন্য ঐক্য জরুরি।'
তার ভাষায়, বাংলাদেশের বর্তমান হিন্দু জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হলে নিজেদের অবস্থার উন্নতি সম্ভব। 'ভারতের ভেতর থেকে এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে হিন্দুরা তাদের জন্য অনেক কিছু করবে—এ বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া যায়,' বলেন তিনি।
তবে এর জন্য সমাজের ভেতরে শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন আছে বলেও মন্তব্য করেন আরএসএস প্রধান। তিনি বলেন, এর লক্ষ্য হবে সচেতনতা ও নিরাপত্তার প্রস্তুতি। এ ক্ষেত্রে সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
একই বক্তব্যে মোহন ভাগবত বলেন, সংঘের কর্মীরা ভাষা শুনে সন্দেহজনক অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে প্রশাসনকে তথ্য দেয়। তার দাবি, শনাক্তকরণ ও নির্বাসনের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে এবং এর গতি বাড়বে।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় কিছু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বিহারসহ পশ্চিমবঙ্গ ও আরও ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চলমান এসআইআর কার্যক্রমে কতজন অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো সাংবিধানিক সংস্থা নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি।
জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতার জন্য তিনি তিনটি কারণকে দায়ী করেন— ধর্মান্তকরণ, অনুপ্রবেশ এবং কম জন্মহার। এই প্রসঙ্গে তিন সন্তান নেওয়ার কথাও বলেন তিনি, তবে এটিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে মোহন ভাগবতের এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা বেড়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ভারত সরকার একাধিকবার ঢাকার কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিবারই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এসব হামলা সংগঠিতভাবে হচ্ছে—এমন অভিযোগ নাকচ করেছে।
বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগে আরএসএস ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো নিয়মিত সরব রয়েছে। সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার কিংবা গত ডিসেম্বরে গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যার ঘটনায় ভারতজুড়ে প্রতিবাদ করেছে আরএসএস, বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনগুলো।
দিল্লিতে বাংলাদেশের দূতাবাস, কলকাতার উপদূতাবাস ও আগরতলায় সহকারী রাষ্ট্রদূতের দপ্তরের সামনেও এসব সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।
দীপু চন্দ্র দাস হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশের ভিসা অফিস ও দূতাবাসে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি স্থানে ভিসা দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে ঢাকা।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ডিসেম্বরে জানায়, 'নিরপেক্ষ সূত্র' থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর দুই হাজার ৯০০-এর বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এও বলেছিল, এসব ঘটনা অতিরঞ্জিত হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তারা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে ভারতের সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত কিছু হামলার ঘটনাও তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
Comments