সংস্কারের নামে চুক্তি, চমকের আড়ালে বিনিয়োগহীনতা
২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল। পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে রাষ্ট্র সংস্কারের যে সামাজিক ও নৈতিক ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তব রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। সেই লক্ষ্যেই বিদেশি ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ খাতে অভিজ্ঞ দুই বাংলাদেশি পেশাদার— লুৎফে সিদ্দিকী ও চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন— রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হন। প্রত্যাশা ছিল, তারা পুরোনো কাঠামোগত ব্যর্থতা কাটিয়ে বাংলাদেশকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রে রূপান্তর করবেন।
কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ব্যবধান ততই স্পষ্ট হয়েছে।
লুৎফে সিদ্দিকী প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর কাজ ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্গঠন, আস্থা ফেরানো এবং আগের সরকারগুলোর সময়ে সংঘটিত অর্থনৈতিক অপরাধ ও খেলাপি ঋণ তদন্তে একটি 'ট্রুথ কমিশন' গঠনের মতো সাহসী উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া। অন্যদিকে আশিক চৌধুরীর দায়িত্ব ছিল বিনিয়োগ সংস্কারের মাধ্যমে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, যা বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, নীতিগত সংস্কার ও ব্যবসায় পরিবেশ উন্নয়নের বদলে তাদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং বড়ো অবকাঠামো প্রকল্পের মতো 'হাই-ভ্যালু ডিল'। এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শক্তি ও সক্ষমতার প্রদর্শনী মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সম্পদ ও সিদ্ধান্তগ্রহণের ওপর নির্ভরতা তৈরি করে, যা সংস্কারের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি।
বিনিয়োগের চিত্র ভয়াবহভাবে হতাশাজনক। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেখানে বিনিয়োগে গতি আসার কথা ছিল, সেখানে উল্টো গতি কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার— গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনাকালেও নতুন বিনিয়োগ-এর চেয়ে বেশি ছিল। নিট এফডিআই কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি মূলত পুরোনো কোম্পানির পুনঃবিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের ফল। নতুন কারখানা, নতুন উদ্যোক্তা কিংবা নতুন কর্মসংস্থান, এসব প্রায় অনুপস্থিত।
দেশীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতিও একই রকম। জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমেছে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে। বহু ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন, যা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় বিনিয়োগ সম্মেলন, বিদেশ সফর ও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো ক্রমেই প্রতীকী হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনে সফরের পরও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে এফডিআই কমেছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের বদলে এসব সফর যেন কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকেছে।
এর বিপরীতে দৃশ্যমান হয়েছে চমক। আশিক চৌধুরীর স্কাই ডাইভিং, বিশ্ব রেকর্ড, জাতীয় দিবসে প্যারাট্রুপিং, সবই প্রচারের আলো কুড়িয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ কোনো অ্যাডভেঞ্চার নয়, যেখানে সাহসী লাফই সাফল্যের মাপকাঠি। বিনিয়োগ আসে নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, পূর্বানুমেয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা থেকে, যেগুলোর কোনোটিতেই দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি।
বিডা চেয়ারম্যানের বক্তব্যে বন্দরের নিম্ন র্যাংকিংয়ের কথা উঠে আসে। প্রশ্ন হলো, এই সমস্যাগুলো সমাধানের দায়িত্ব কার? সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে এসে যদি ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় পুরোনো সমস্যার তালিকা দেওয়া হয়, তাহলে সেই সংস্কার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন কিছুটা ঠেকাতে পেরেছে, এটি স্বীকার করতেই হয়। কিন্তু বিনিয়োগ ছাড়া এই সাফল্য টেকসই নয়। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান হয় না, শিল্পায়ন এগোয় না, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হয় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ব্যক্তিগত সক্ষমতার নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির। রাষ্ট্র সংস্কার মানে শুধু বড়ো চুক্তি, বড়ো সফর বা বড়ো চমক নয়। রাষ্ট্র সংস্কার মানে এমন নীতি ও প্রতিষ্ঠান গড়া, যেখানে বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবে আসবে প্রচার ছাড়াই। সেই জায়গায় লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরীর ভূমিকা প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি কেবল দুই ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, এটি গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের একটি নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প।
Comments