বালুচিস্তানে বিদ্রোহের বিস্ফোরণ
ঢাকা জার্নাল বিশ্লেষণ
পাকিস্তানের বালুচিস্তান আজ আর শুধুই একটি অশান্ত প্রদেশ নয়,এটি কার্যত রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। শুক্রবার ও শনিবার বালুচ লিবারেশন আর্মির নেতৃত্বে যে সুসংগঠিত ও একযোগে আক্রমণ চালানো হয়েছে,তা ইসলামাবাদের নিরাপত্তা দাবি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানী কোয়েটা থেকে শুরু করে মাস্তুং,গোয়াদর, নশ্কি ও কালাত সহ একাধিক শহরে বিদ্রোহীদের দাপট স্পষ্ট করে দিয়েছে,বন্দুকের জোরে 'ঐক্য' ধরে রাখার নীতি কতটা ফাঁপা।
একসঙ্গে ১২টিরও বেশি জায়গায় হামলা,পুলিশ স্টেশন ও সরকারি ভবন দখল,বন্দী পলাতক,ব্যাংক লুট ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। এসব কোনও বিচ্ছিন্ন জঙ্গি তৎপরতা নয়। এটি ছিল পরিকল্পিত,সমন্বিত এবং রাজনৈতিক বার্তাবাহী অভিযান। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়,পাকিস্তানের রাজধানী-সমতুল্য প্রশাসনিক শহর কোয়েটায় দু'ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভারী গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণ চললেও রাষ্ট্র দ্রুত ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে,বালুচিস্তানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি আসলে কতটা ভঙ্গুর।
পাকিস্তান সরকার বরাবরের মতোই সংখ্যার খেলায় মেতেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর ১০ জন নিহত বনাম ৯২ জন বিদ্রোহী নিহতের দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো,সংখ্যার এই লড়াই আদৌ কি বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করতে পারছে? যদি সত্যিই এত বিপুল সংখ্যক বিদ্রোহী নিহত হয়ে থাকে, তবে কীভাবে একই সঙ্গে একাধিক শহরে আক্রমণ,দখল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ সম্ভব হলো? এই অসঙ্গতি আসলে রাষ্ট্রীয় প্রচারের সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে।
বালুচিস্তানের সংকট নতুন নয়। দশকের পর দশক ধরে এই প্রদেশকে পাকিস্তানের 'কলোনি' হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রদেশটির গ্যাস,খনিজ,বন্দর সব নেওয়া হয়েছে,অথচ উন্নয়ন,রাজনৈতিক অধিকার ও সম্মান দেওয়া হয়নি। বালুচ জনগোষ্ঠীর অভিযোগ-তাদের ভূমিতে সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি,আর স্থানীয়রা থাকে কেবল দর্শক। এই কাঠামোগত বৈষম্য ও দমননীতিই আজ সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক ইঙ্গিত এসেছে মাস্তুংয়ের ঘটনা থেকে,যেখানে বিদ্রোহীরা পুলিশ স্টেশন ও শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং ৩০ জনের বেশি বন্দী পালিয়ে যায়। এটি শুধু নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয়;এটি প্রশাসনিক ভাঙনের লক্ষণ। রাষ্ট্র যদি তার নিজস্ব কারাগার ও পুলিশ স্টেশন রক্ষা করতে না পারে,তবে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়?
গোয়াদর বন্দরের গুরুত্ব পাকিস্তান ও চীন উভয়ের কাছেই কৌশলগত। সেখানকার অশান্তি সরাসরি সিপিইসি প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে বালুচিস্তানের এই বিদ্রোহ কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়;এটি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপরও আঘাত। বন্দুকের আওয়াজে উন্নয়নের গল্প বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুল হলো-প্রতিটি রাজনৈতিক অসন্তোষকে 'জঙ্গিবাদ' বলে দাগিয়ে দেওয়া। এতে স্বল্পমেয়াদে দমন সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষোভ আরও গভীর হয়। বালুচিস্তানে সেনা মোতায়েন,চেকপোস্ট,নিখোঁজের অভিযোগ-এসব মিলিয়ে একটি পুরো জনগোষ্ঠী নিজেকে পরাধীন মনে করতে শুরু করেছে। ফলাফল আজকের এই বিস্ফোরক পরিস্থিতি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন একটাই-পাকিস্তান কি আদৌ রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটতে প্রস্তুত? নাকি আবারও পুরনো ফর্মুলা অর্থাৎ বুলেট, সেনা অভিযান আর তথ্য নিয়ন্ত্রণের পথেই চলবে? ইতিহাস বলছে,এই পথ কখনও স্থায়ী শান্তি দেয়নি।
বালুচিস্তান আজ পাকিস্তানের আয়না। এই আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা,ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অবহেলা। যদি ইসলামাবাদ এখনই বাস্তবতা স্বীকার না করে,সংলাপ ও ন্যায্য রাজনৈতিক সমাধানের পথে না এগোয়,তবে বালুচিস্তানের আগুন শুধু প্রদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা পুরো পাকিস্তানের স্থিতিশীলতাকেই গ্রাস করবে।
Comments