নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণার ভাষা উর্দু
'মেরি মা বাহিনো, আপকা পিয়ারা আপকা দুলারা... আপনা কিমতি ভোট দেকর কামিয়াব কিজিয়ে।' সৈয়দপুর শহরের অলিগলি এখন এমন উর্দু ভাষার নির্বাচনী প্রচারণায় মুখর। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে বইছে উৎসবের আমেজ। তবে এই আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি বরাবরের মতোই আটকে আছে অবাঙালি বা উর্দুভাষী ভোটারদের হাতে।
সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন- জাতীয় পার্টির মো. সিদ্দিকুল আলম (লাঙ্গল), বিএনপির মো. আব্দুল গফুর সরকার (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী আব্দুল মুনতাকিম (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহিদুল ইসলাম (হাতপাখা)। পাশাপাশি রয়েছেন একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী।
পোস্টার, মাইকিং আর পথসভায় প্রার্থীরা দিনরাত এক করে ফেললেও সৈয়দপুর শহরের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এখানে প্রচারণার ভাষা দুটি- বাংলা ও উর্দু। স্থানীয়দের মতে, এই আসনে জয়ী হতে হলে অবাঙালি ভোটারদের মন জয় করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪৯ জন। এর মধ্যে কেবল সৈয়দপুর উপজেলাতেই ভোটার রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৪ জন। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই উপজেলার ভোটারদের মধ্যে ৭৫ হাজার ৬৭ জনই অবাঙালি। গত নির্বাচনের তুলনায় এবার এই ভোট বেড়েছে ২ হাজার ৮৪৬টি, যা যেকোনো প্রার্থীর ভাগ্য বদলে দিতে যথেষ্ট।
বাস্তবতার প্রতিফলন শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, আবাসিক এলাকায় প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মাইকিংয়ে শোনা যাচ্ছে দুই ভাষার ভোট প্রার্থনা। এতে বোঝা যায়, এই আসনে অবাঙালি ভোটারদের গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত বাস্তব। নির্বাচনী প্রচারণায় উর্দু ভাষার ব্যবহার সৈয়দপুরে নতুন কিছু নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় উর্দুতে মাইকিং করেন। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মাইকিংয়ে শোনা যাচ্ছে- 'মেরি মা বাহিনো, আপকা পিয়ারা আপকা দুলারা ১২ ফেব্রুয়ারি কো আপনা কিমতি ভোট দেকর কামিয়াব কিজিয়ে।'
প্রার্থীদের বলছেন, নতুন প্রজন্মের অনেক অবাঙালি বাংলা বুঝলেও প্রবীণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও উর্দুতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ফলে প্রতীক ও প্রার্থী পরিচিত করাতে উর্দু ভাষাই তাদের কাছে বেশি কার্যকর।
অবাঙালি বসতির ইতিহাস ও বর্তমান সৈয়দপুরে অবাঙালিদের বসতির ইতিহাস দীর্ঘ। ব্রিটিশ আমলে রেলওয়ে কারখানাকে কেন্দ্র করে ভারতের বিহার অঞ্চল থেকে আসা শ্রমিক ও কর্মচারীরা এখানে বসতি গড়ে তোলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অনেকে ফিরে গেলেও একটি বড় অংশ পরিবারসহ সৈয়দপুরে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অবাঙালিরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। ফলে সৈয়দপুর ধীরে ধীরে বাঙালি-বিহারী মিশ্র শহরে রূপ নেয়। বর্তমানে অনেক অবাঙালি পরিবার শহরে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির মালিক। তবে এখনও নিম্ন আয়ের পাকিস্তান প্রত্যাশী অবাঙালিদের একটি অংশ শহরের ২২টি 'আটকে পড়া ক্যাম্পে' বসবাস করছেন।
ভোটের পরিসংখ্যান ও গেম চেঞ্জার সৈয়দপুর বরাবরই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। আর এখানকার বড় অংশের ভোটার অবাঙালি হওয়ায় নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে তারা হয়ে ওঠেন 'গেম চেঞ্জার'।
আশ্বাস ও বঞ্চনার আক্ষেপ উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল বলেন, 'আমরা ভোটাধিকার পেয়েছি, আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে চাকরি করছে। কিন্তু নির্বাচন এলেই শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়। বাস্তবে উন্নয়ন খুব একটা দেখি না। পানি, ড্রেনেজ, বাসস্থান সবখানেই সংকট। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের সময় ক্যাম্পে আসে, কিন্তু নির্বাচনের পর আর তেমন খোঁজ থাকে না।'
১৯৮৪ সালে আসনটি গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও ন্যাপ (মোজাফফর) সব দলই এখানে জয় পেয়েছে। ফলে নীলফামারী–৪ বরাবরই একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসন।
Comments