কর্মক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের জন্য সমতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের আহ্বান
কর্মক্ষেত্রে সমতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়—এমন অভিমত উঠে এসেছে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে। বক্তারা বলেন, নীতিমালার কাগজে নয়, দৈনন্দিন চর্চায় কর্মক্ষেত্রের সমতা প্রতিফলিত হতে হবে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাজধানীর রমনা এলাকায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরে 'প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্রে সমতা: মানবাধিকার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ন্যায়বিচার' শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে আইইবির উইমেন ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টার (ডব্লিউইসি)।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইইবির সভাপতি ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রেজু) বলেন, প্রকৌশলীরা দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পেশার ভেতরে বৈষম্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয়কেই দুর্বল করে। তিনি বলেন, "কর্মক্ষেত্রে সমতা শুধু নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বাস্তব চর্চায় তার প্রতিফলন থাকতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে আইইবিকে হয়রানি ও অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য কর্মপরিবেশ টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, প্রকৌশল খাতকে শক্তিশালী করতে নারী প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, "আমাদের কর্মক্ষেত্রে নারী প্রকৌশলীদের পেশাগত অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।"
নারী প্রকৌশলীদের পেশাগত বিকাশে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "নারী প্রকৌশলীদের এগিয়ে নিতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।"
মূল প্রবন্ধে আইন মন্ত্রণালয়ের জেলা ও দায়রা জজ লুবনা জাহান বলেন, পেশাগত পরিবেশে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা অনেক সময় ভয়, সামাজিক কলঙ্ক ও ক্ষমতার অসমতার কারণে প্রকাশ পায় না।
তিনি বলেন, "অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাবেন না—এই আশঙ্কায় নীরব থাকেন।" এ ক্ষেত্রে গোপন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও ভুক্তভোগীবান্ধব আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও অভিযোগ না করার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ পুলিশের পুলিশ সুপার নুসরাত জাহান মুক্তা বলেন, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও সহিংসতাকে কখনোই ব্যক্তিগত বা অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, "কর্মক্ষেত্রের সহিংসতা একটি সামাজিক ও ফৌজদারি অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অপরাধীকে আড়াল না করে সহযোগিতা করতে হবে।" এ জন্য পেশাজীবী সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সেমিনারে নারী নেতৃত্ব বিকাশে আইইবির ভূমিকা নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন ডব্লিউইসির সদস্য প্রকৌশলী নাজিফা তাসনিম।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি সোলারিক গ্রুপের পরিচালক প্রকৌশলী নাজনীন আক্তার বলেন, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়োগকর্তাদেরই নিতে হবে।
সরকারি খাতের প্রতিনিধি টিটাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুহাম্মদ আবদুল কাওছার কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (জিআরএস) এবং বাধ্যতামূলক নৈতিকতা ও আচরণবিধি প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আইইবির সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান বলেন, প্রকৌশল পেশায় সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
আইইবির সহসভাপতি (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোর্শেদ ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদের মধ্যে মানবাধিকার ও লিঙ্গসংবেদনশীলতা বাড়াতে একাডেমিয়া ও পেশাগত চর্চার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির সহসভাপতি (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এ টি এম তানবীর-উল হাসান (তামাল) মানবাধিকার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন।
অন্য বিশেষ অতিথি আইইবির সহসভাপতি (সেবা ও কল্যাণ) প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া ডব্লিউইসির উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, আইইবিতে এ ধরনের বিষয় নিয়ে এটি প্রথম সেমিনার। তিনি চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
আইইবির সহসভাপতি (এইচআরডি) প্রকৌশলী শেখ আল আমিন বলেন, প্রকৌশল পেশায় নারীর ক্ষমতায়ন আইইবির ভেতর থেকেই শুরু হওয়া উচিত। এ জন্য আইইবির নির্বাহী কমিটিতে নারী প্রকৌশলীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, কর্মক্ষেত্রে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারক, নিয়োগকর্তা, পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মানবাধিকার ও লিঙ্গসংবেদনশীলতা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানান তাঁরা।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন ডব্লিউইসির সহসভানেত্রী প্রকৌশলী দিলরুবা ফারজানা। তিনি নারী প্রকৌশলীদের জন্য নিরাপদ পেশাগত পরিবেশ গড়ে তুলতে ডব্লিউইসির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রয়াত প্রকৌশলী মুনমুন খান-এর স্মরণে একটি বিশেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ২০২৫ সালে ডব্লিউইসির কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রতিফলনমূলক আলোচনা এবং নারী উদ্যোক্তা প্রকৌশলীদের স্টল পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়।
সেমিনারে প্রকৌশলী, আইন বিশেষজ্ঞ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের হাতে স্মারক তুলে দেন ডব্লিউইসির সদস্য প্রকৌশলী নাজিফা আনজুম নাবিলা ও রিমি রশিদ।
সেমিনারটি শেষ হয় কর্মক্ষেত্রে সমতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে ডব্লিউইসি ও আইইবির ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে।
Comments