কারা চ্যালেঞ্জ করছে ইরানের সরকারকে
সরকারবিরোধী আন্দোলন ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসকদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ১৯৭৯ সাল থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শাসকদের ওপর বিরোধীপক্ষগুলোর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তাদের মধ্যে কেউ দেশের ভেতরে ও কেউ অন্য দেশে থেকে (নির্বাসিত) বিরোধীতা করছেন।
যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ কিছু দেশে থাকা ব্যক্তিরাও বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে সমাবেশ করছেন। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও মাসুদ পেজেশকিয়ান সরকারের বিরোধীতাকারী প্রধান পক্ষগুলোর মধ্য আছে- ক্ষমতাচ্যুত শাহ রাজবংশ ও রেজা পাহলভি, মরিয়ম রাজাভি ও পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন, ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের সমর্থক জোট এবং সংখ্যালঘু কুর্দিশ ও বালুচ সম্প্রদায়।
রেজা পাহলভি ও রাজতন্ত্র
৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে। তিনি সাবেক শাহ রাজবংশের উত্তরাধিকারী ও স্বঘোষিত রাজপুত্র।
১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত তেল সম্পদকে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেন। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাজতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই বছর ইরানি বিপ্লব শুরু হলে শাহ মোহাম্মদ দেশত্যাগ করেন। ১৯৮০ সালে তিনি মিশরে মারা যান।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভি রাজতান্ত্রিক আন্দোলন 'ইরান ন্যাশনাল কাউন্সিল' এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি নিজে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছেন না। বরং তিনি একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে। রেজা পাহলভির দাবি, গণভোটের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। তবে রেজা পাহলভির সমর্থকদের মধ্যেই একটি পক্ষ রাজতন্ত্র ফেরাতে চায়। এই পক্ষের লোকজন প্রবাসী ইরানি কমিউনিটির সদস্য।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি রাজনীতি ও ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মরিয়ম আলেমজাদে বলছেন, ২০২২ সালে মাশা আমিনি নিহতের প্রতিবাদে হওয়া বিক্ষোভের সময় রেজা পাহলভি প্রভাবশালী বিরোধী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি নির্বাসিতদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মেরও সমর্থন পেয়েছেন।
আলেমজাদের মতে, পাহলভির জনপ্রিয়তা নেতৃত্ব বা কোনো বাস্তব পরিকল্পনার কারণে নয়। তিনি সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিজের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। যারা বর্তমান শাসকদের প্রতি হতাশ তারাই পাহলভিকে বিকল্প হিসেবে পছন্দ করছেন। এ ছাড়া, পাহলভিকে ইসরায়েলও সহায়তা দিচ্ছে।
পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন
ইরানে মুজাহিদিন একটি প্রভাবশালী বামপন্থী গোষ্ঠী ছিল। ১৯৭০ এর দশকে তারা শাহের সরকার এবং মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালায়। কিন্তু পরে অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই গোষ্ঠী সাধারণত মুজাহিদিন-ই খালক অর্গানাইজেশন বা সংক্ষেপে এমইকে নামে পরিচিত।
এই গোষ্ঠীটি বিতর্কিত ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণে। ১৯৮০ থেকে ৮৮ সালে হওয়া যুদ্ধে এমইকে ইরানের বিরুদ্ধে গিয়ে ইরাকের পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনেক বিরোধীরাও বর্তমানে গোষ্ঠীটিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে।
ইরানের গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ব্যাপারে মুজাহিদিন গোষ্ঠীই ২০০২ সালে প্রথম তথ্য প্রকাশ করে। এরপর ইরানের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়নি। গোষ্ঠীটির নেতা মাসউদ রাজাভি প্রথমে ফ্রান্স ও পরে ইরাকে নির্বাসিত হন। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী মরিয়ম রাজাভি মুজাহিদিনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফ্রান্স, আলবেনিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়।
'সলিডারিটি ফর আ সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক ইন ইরান'
এই পক্ষের লক্ষ্য ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপ দেওয়া। মূলত দেশটির বাইরে অবস্থান করা কয়েকটি গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে ২০২৩ সালে 'হামগামি' নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করে।
২০২২ সালে মাশা আমিনি হত্যার পর এই জোট প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। ২২ বছর বয়সী আমিনিকে ইরান পুলিশের নৈতিকতা সংক্রান্ত ইউনিট আটক করে। হিজাব ঠিকভাবে না পরার কারণে তাঁকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। সে অবস্থায় আমিনি মারা যান। এর প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় হামগামি জোট ইরানে ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ, স্বাধীন নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে ইরানের ভেতরে এটি বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মরিয়ম আলেমজাদে বলছেন, 'আমার মনে হয়, জনসাধারণের মধ্যে এটি (হামগামি) তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না।'
সংখ্যালঘু কুর্দিশ ও বালুচ সম্প্রদায়
ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে ৬১ শতাংশ পার্সিয়ান। উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে আছে আজারবাইজানি (১৬ শতাংশ) এবং কুর্দিশ বা কুর্দ (১০ শতাংশ)। অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে লুর (৬ শতাংশ), আরব (২ শতাংশ), বালুচ (২ শতাংশ) এবং তুর্কি (২ শতাংশ)।
সংখ্যালঘু অধিকারভিত্তিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ শিয়া মুসলিম। সুন্নি ও অন্যান্য গোষ্ঠীর সদস্য প্রায় ৯ শতাংশ। বাকি এক শতাংশের মধ্যে আছে বাহাই, খ্রিস্টান, ইহুদি, জোরোস্ত্রীয় এবং সাবীয়ান মান্দেইন।
ইরানের কুর্দ ও বালুচ সংখ্যালঘুদের বেশিরভাগ সুন্নি মুসলিম। তারা প্রায়ই তেহরানের পার্সি ভাষী শিয়া মুসলিমপ্রধান সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। পশ্চিম ইরানে কুর্দ গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিরোধিতা করে আসছে। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময় সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় বিদ্রোহের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া, পাকিস্তান সীমান্তবর্তী সিস্তান-বালুচিস্তানে সুন্নি নেতাদের সমর্থক এবং আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। তারাও তেহরান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
আন্দোলনে স্পষ্ট নেতৃত্ব নেই কেন
ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা বিরোধীগোষ্ঠীগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং তাদের লক্ষ্যও ভিন্ন। কারও কারও স্পষ্ট নেতৃত্ব আছে, আবার অনেকের নেই। তবে চলমান আন্দোলনে ইরানের ভেতরে এখনো কোনো ব্যক্তি স্পষ্ট বিরোধী নেতা হিসেবে উঠে আসেননি। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, পরিচিত নেতৃত্ব সামনে এলে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার হওয়ার আশঙ্কা।
অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদে মনে করেন, ইরানে বর্তমানে এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠী নেই, যারা সরকার গঠনের মতো অবস্থানে যেতে পারে।
২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর কারচুপির অভিযোগ তুলে ইরানে 'গ্রিন মুভমেন্ট' শুরু হয়। তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মির-হোসেইন মুসাভি আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার মেহদি কাররুবিও সে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁকেও গৃহবন্দী করা হয়।
ওই আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের পরিণতির কারণেই চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে একক কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে কর্মসূচি পালন করতে দেখা যাচ্ছে না।
Comments