উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা: শূন্য অগ্রগতির প্রকল্পে রাষ্ট্রের দায় কোথায়?
উন্নয়নশীল দেশের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কেবল একটি বাজেট নথি নয়; এটি জনগণের করের টাকা কীভাবে দেশের অবকাঠামো, সেবা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় রূপান্তরিত হবে তার রূপরেখা। কিন্তু বাস্তব চিত্র যখন উল্টো কথা বলে,তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা কি সত্যিই উন্নয়নের পথে এগোচ্ছি, নাকি উন্নয়নের নামে স্থবিরতাকে নিয়মে পরিণত করেছি?
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই উদ্বেগকেই আরও স্পষ্ট করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পে একেবারেই কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি,অথচ এসব প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৮,৩৮৩.৬৫ কোটি টাকা। অর্থ ব্যয় হয়েছে মূলত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও দপ্তর পরিচালনার খরচে,কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজের চিহ্ন নেই। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়,এটি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
এই সমস্যাটি নতুন নয়। গত অর্থ বছরে শূন্য অগ্রগতির প্রকল্প ছিল ২১১টি, তার আগের বছর ছিল ১০৪টি। অর্থাৎ বছর যত যাচ্ছে, প্রকল্প নেওয়ার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে অকার্যকর প্রকল্পের তালিকাও। ২০২৫-২৬-এ ১,০১১টি প্রকল্পে ভৌত অগ্রগতি ২৫ শতাংশেরও কম-এটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। আরও উদ্বেগজনক হলো,যেসব প্রকল্পকে "সমাপ্ত" ঘোষণা করা হয়েছে,তার একটি বড় অংশে শতভাগ কাজ বাস্তবে শেষই হয়নি।
প্রতিবেদনটি বলছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ২৩টি প্রকল্প, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১১টি প্রকল্পসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি নেই। এর আগের বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, এলজিইডি, বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো সংস্থাগুলোর প্রকল্পও একইভাবে স্থবির ছিল। অর্থাৎ সমস্যা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের নয়; এটি পুরো উন্নয়ন ব্যবস্থার একটি গভীর সংকট।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হচ্ছে? আইএমইডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রকল্প নেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাব সবচেয়ে বড় কারণ। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অভাব, এমনকি বিদেশি অর্থায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ-সব মিলিয়ে প্রকল্প শুরুর আগেই ব্যর্থতার বীজ বপন করা হয়। এরপর বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলে থাকে, সময় বাড়ে, ব্যয় বাড়ে,কিন্তু দায়ী কেউ হয় না।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে -জবাবদিহি কোথায়? কোনো প্রকল্প যদি এক বা একাধিক বছর ধরে শূন্য অগ্রগতিতে পড়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক,বাস্তবায়নকারী সংস্থা কিংবা তদারকি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? বাস্তবে দেখা যায়, প্রায় কিছুই না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দুর্বল নজরদারি এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দায় এড়ানোর প্রবণতার কারণে একই সমস্যা বছরের পর বছর পুনরাবৃত্তি হয়।
এই স্থবিরতা দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতিকর। উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যায়, অর্থ আটকে থাকে, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয় না। প্রকল্প বিলম্বিত হলে ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বোঝা হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, যেসব প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণ সেবা পাওয়ার কথা—বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি সহায়তা, সেসবের সুফল পেতে দেরি হয়,কখনো আদৌ পাওয়া যায় না।
আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, ১,৪৬৮টি প্রকল্পের মধ্যে ১১০টিতে এক টাকাও খরচ হয়নি,যদিও বরাদ্দ ছিল ২,৪৫৯.৮১ কোটি টাকা। আরও ১৩৪টি প্রকল্পে খরচ হয়েছে বরাদ্দের ২৫ শতাংশেরও কম। এই চিত্রকে "হতাশাজনক" বলা হলেও,বাস্তবে এটি অনেক বেশি গুরুতর। কারণ এটি কেবল অর্থ খরচ না হওয়ার গল্প নয়; এটি সময়, সুযোগ এবং জনগণের আস্থার অপচয়ের গল্প।
সমাধান কী? প্রথমত, প্রকল্প গ্রহণের আগে কঠোর প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে, বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রিম অগ্রগতি,অর্থায়নের স্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া কোনো প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ভিত্তিক স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিয়মিত স্বাধীন মূল্যায়ন জরুরি। তৃতীয়ত,সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শূন্য অগ্রগতির জন্য প্রকল্প পরিচালকদের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ না করলে এই চক্র ভাঙবে না।
উন্নয়ন মানে শুধু প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো নয়; উন্নয়ন মানে বাস্তব ফলাফল। যতদিন আমরা কাগজে-কলমে উন্নয়নে সন্তুষ্ট থাকব,ততদিন মাঠপর্যায়ে শূন্য অগ্রগতির এই লজ্জাজনক চিত্র বদলাবে না। এখনই সময়,উন্নয়নের নামে স্থবিরতাকে আর স্বাভাবিক বলে মেনে না নেওয়ার।
Comments