ইরানে বিক্ষোভের ছায়ায় ফের সক্রিয় শাহ-পুত্র রেজা পহলভি: অতীত, যোগসূত্র ও বর্তমান রাজনীতির সমীকরণ
দু'সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরান জুড়ে ব্যাপক ও প্রাণঘাতি বিক্ষোভ চলার মধ্যেই ফের সরকারের বিরোধী প্রতীকী মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন রেজা পহলভি-ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মহম্মদ রেজা পহলভির আমেরিকাপ্রবাসী পুত্র।
ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে লাগামছাড়া দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে যে আন্দোলনের সূচনা, তা দ্রুতই রূপ নেয় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভে। যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনি অনড় অবস্থান নিয়েছেন এবং এই অস্থিরতার জন্য আমেরিকাকেই দায়ী করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে রেজা পহলভি ইরানের সরকারি কর্মচারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর ইরানে ফেরার সময় 'খুব কাছেই'। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন-প্রয়োজনে 'ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকতে'।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ইরানের ইতিহাসের সঙ্গে রেজা পহলভির সম্পর্ক কী, আর চলমান সংকটে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তাঁর সামনে কী ঝুঁকি ও সম্ভাবনা?
১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর তেহরানে জন্ম রেজা পহলভির। তিনি ছিলেন শাহ মহম্মদ রেজা পহলভি ও সম্রাজ্ঞী ফারাহ পহলভির উত্তরাধিকারী। মাত্র সাত বছর বয়সেই তাঁকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে তাঁর পিতা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই নির্বাসনে জীবন কাটাচ্ছেন রেজা। বিপ্লবের ঠিক এক বছর পরেই মৃত্যু হয় প্রাক্তন শাহের।
নিজের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিমানচালনার প্রশিক্ষণ নিতে ইরান ছাড়েন রেজা পহলভি। সেই সময়েই ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছায় এবং ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে রাজপরিবার দেশত্যাগে বাধ্য হন। পরবর্তীতে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন ইরানের সেনাবাহিনীতে যুদ্ধবিমান চালক হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী হতে চাইলেও ইসলামি শাসন তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।
১৯৮৬ সালের ১২ জুন ইয়াসমিন এতেমাদ-আমিনির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের তিন কন্যা। তিনজনকেই পর্যায়ক্রমে তিনি নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছেন।
রেজা পহলভির ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, তিনি ইরানের ভিতরে ও বাইরে থাকা বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং দেশে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর মতে, অহিংস নাগরিক অসহযোগের মাধ্যমেই শাসন পরিবর্তন হওয়া উচিত এবং ভবিষ্যৎ সরকার নির্ধারণে একটি মুক্ত ও স্বচ্ছ গণভোট প্রয়োজন।
বর্তমান ইসলামি শাসনে ইরান ও ইসরায়েল চরম শত্রু হলেও, তাঁর পিতার আমলে দু'দেশের সম্পর্ক ছিল অনেকটাই উষ্ণ। গত বছরের অক্টোবরে ইজরায়েল-সমর্থিত কিছু ফার্সি ভাষার অনলাইন প্রচারে ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া পরিচয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রেজা পহলভির প্রচার চালানো হয় এবং তার মাধ্যমে ইরানি সরকারকে অস্থির করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম ও টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিজেন ল্যাবের সমান্তরাল তদন্তে এই তথ্য সামনে আসে।
গত বছর ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধে রেজা পহলভি প্রকাশ্যে খামেনিকে 'ইরানের জনগণের স্বার্থে' পদত্যাগের আহ্বান জানান। বর্তমান আন্দোলনের সময়েও তিনি বিদেশে থাকা ইরানি দূতাবাসগুলির বাইরে ইসলামি বিপ্লব-পূর্ব ইরানি পতাকা উত্তোলনের ডাক দেন। লন্ডনে বিক্ষোভকারীরা স্বল্প সময়ের জন্য সেই পতাকা ওড়াতে সফলও হন।
সব মিলিয়ে, ইরানের উত্তাল রাজনীতিতে ফের একবার ইতিহাস, নির্বাসন আর ক্ষমতার স্মৃতি নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছেন শাহ-পুত্র রেজা পহলভিকে।
Comments