ইরানে হামলার ইঙ্গিত, আলোচনার আগেই পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ইরানে চলমান গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সামরিক হস্তক্ষেপসহ 'খুব কঠোর' বিভিন্ন অপশন বিবেচনার কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে আলোচনার সম্ভাবনার কথা উঠলেও, অন্যদিকে যেকোনও সময় সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। আর তার এই হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। খবর আল জাজিরা
রোববার গভীর রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, 'আমরা (ইরানের বিক্ষোভ পরিস্থিতি মোকাবিলার) বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সামরিক বাহিনীও এটি খতিয়ে দেখছে, আমরাও কয়েকটি খুব কঠোর অপশন বিবেচনা করছি। শেষ পর্যন্ত আমরা একটা সিদ্ধান্ত নেব।'
তিনি আরও বলেন, সামরিক পদক্ষেপের হুমকির পর ইরানের নেতৃত্ব আলোচনার আগ্রহ দেখিয়ে যোগাযোগ করেছে এবং একটি বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প সতর্ক করে দেন, 'বৈঠকের আগেই আমাদের হয়তো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।'
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে যখন ইরানি নেতারা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ বলেছেন, 'ইরানের ওপর হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ টার্গেটে পরিণত হবে।'
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক পতনের প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ করলে বিক্ষোভের সূচনা হয়। দ্রুতই তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পরে তা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশ শাসন করে আসা ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরোধিতায় রূপ নেয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চলমান অস্থিরতায় অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বিক্ষোভে নিহত সাধারণ মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি। এর বিপরীতে, দেশের বাইরে অবস্থানরত বিরোধী কর্মীরা দাবি করছেন, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং শত শত বিক্ষোভকারীও নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইরানে চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)। রোববার এই তথ্য প্রকাশের মধ্যেই তেহরান সতর্ক করে বলেছে, বিক্ষোভকারীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। মূলত ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মীয় নেতৃত্ব। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন যে বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা হলে তিনি হস্তক্ষেপ করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তারা ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা যাচাই করেছে। দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। বার্তাসংস্থা রয়টার্সও এই তথ্যগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
আল জাজিরা বলছে, ইরানে চলমান এই পরিস্থিতির মধ্যেই দেশজুড়ে টানা ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। মূলত ইরানের এই অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিচ্ছে যখন ট্রাম্প আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনা এবং গ্রিনল্যান্ড কেনা বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দখলের আলোচনাও রয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মঙ্গলবার ইরান বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচ্য বিকল্পগুলোর মধ্যে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা এবং সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অনলাইনে সহায়তা দেয়ার বিষয়ও রয়েছে।
এছাড়া রোববার ট্রাম্প জানান, ইরানে ইন্টারনেট পুনরায় চালুর বিষয়ে তিনি ধনকুবের ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন। স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা 'স্টারলিংক' প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'এই ধরনের কাজে সে খুবই দক্ষ, তার কোম্পানিও খুব ভালো।'
এ সময় ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ও ভেনেজুয়েলা নিয়েও কথা বলেন। গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে তিনি ডেনমার্কের ওই আর্কটিক অঞ্চলকে 'চুক্তিতে আসার' আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমরা এটি অধিগ্রহণের কথা বলছি, কোনও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির কথা নয়।'
ভেনেজুয়েলা বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি মঙ্গলবার বা বুধবার দেশটির বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে বৈঠক করবেন।
Comments