অদৃশ্য সমীকরণে বন্দি তারেক রহমানের দেশে ফেরা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। দেশের মানুষ তাঁর জন্য প্রার্থনা করছে। হাজার হাজার নেত্রাকর্মী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমান। কিন্তু এ খবরের চেয়েও বড় খবর এখন বেগম জিয়ার একমাত্র ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফিরে না আসা।
সতের বছরেরও বেশি সময় তারেক রহমান দেশের বাইরে। সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সবার প্রত্যাশা ছিল শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি ঠিকই দেশে আসবেন। কিন্তু এই ১৫ মাসেও তিনি এলেন না। এবার সবার ধারণা হলো মায়ের এই অসুস্থতার সময় নিশ্চয়ই তিনি ফিরবেন। কিন্তু সেটাও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। দলের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, নভেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন লন্ডনে ১৭ বছর ধরে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা তারেক রহমান। পরে জানানো হয়, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তিনি আসতে পারেন। তবে শনিবার তারেক রহমান জানান, তাঁর দেশে আসা নিশ্চিত নয়। এখন যে বিবৃতি তিনি নিজে দিলেন তা বড় রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তারেক রহমান লিখেছেন, 'এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ-স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে কোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।' ফেসবুকে তারেক রহমান যা বলেছেন তাতে মনে হয় দেশে আসার বিষয়টি তার নিজের ওপর নির্ভর করছে না এবং আরও অনেক ফ্যাক্টর আছে যার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত প্রশ্ন, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও জটিল প্রশ্ন এখন তারেক রহমানের দেশে ফেরা। এখন তো এলেন না, তাহলে কি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া দেশে ফিরতে পারবেন? সেটাও অনিশ্চিত। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিয়ম অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর নতুনভাবে ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ ভোটার না হলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না -এ এক কঠিন বাস্তবতা। তবে কাগজের এই সীমাবদ্ধতার চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন তাঁর অনুপস্থিতি।
খালেদা জিয়া আশঙ্কাজনক অসুস্থ। এমন পরিস্থিতিতে দেশের মাটিতে বিএনপির নেতৃত্ব কে দেবে -এই উদ্বেগ তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ দলীয় প্রধানের অবস্থার চূড়ান্ত সংকটময় সময়ে তাঁর একমাত্র রাজনৈতিক উত্তরসূরি দেশের বাইরে।
তারেক জিয়ার সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট পরিস্থিতিকে আরও ধোঁয়াশা করেছে। তিনি লিখেছেন- মা মৃত্যুশয্যায়, তবুও এখন দেশে ফিরতে পারবেন না, কারণ এই সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে নিতে পারেন না। এই একটি লাইনে যেন অদৃশ্য এক শক্তির ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। প্রশ্ন উঠছে -কোন শক্তি তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? কে বা কী তাঁকে আটকে রেখেছে?
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো - দেশে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রও বাধা দিচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ফিরে আসায় কোন বিধি নিষেধ নেই। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস নিজে লন্ডনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। তাহলে তিনি ফিরতে পারছেন না কেন? কী সেই অচেনা বাঁধন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে স্পষ্ট হয় -বিষয়টি এখন আর কেবল দলের ভেতরকার রাজনীতি নয়; এখানে সক্রিয় গভীর আন্তর্জাতিক সমীকরণ। ক্ষমতার পরিবর্তনের সম্ভাবনা ঘনিয়ে আসছে - এমন সময়ে বিএনপির প্রধান নির্বাহী সিদ্ধান্তদাতা লন্ডনে থেকে নিস্ক্রিয় থাকলে সেটি কেবল রাজনৈতিক নয় বরং ভূরাজনৈতিক ভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ছাড়া বিএনপির বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপির পক্ষে অনুকূল। তবুও তারেক জিয়ার দেশে না ফেরা সমর্থকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
যখন দেশে তাঁর পথ রুদ্ধ নয়, কোনো আইনগত বাধা নেই, সরকারও বাধা দিচ্ছে না - তখন তাঁর এই অনিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই নতুন রহস্য তৈরি করছে। তিনি কি আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিশ্রুতি, চাপ বা অঘোষিত চুক্তির কারণে ফিরে আসতে পারছেন না? নাকি দলের ভেতরকার বিভাজন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিবেচনাই মূল কারণ?
যা-ই হোক, স্পষ্ট কথা হলো-তারেক জিয়ার নীরবতা ও দেশে না ফেরার ধোঁয়াশা এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তাঁর অনিশ্চিত অবস্থান শুধু বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নয়, আসন্ন নির্বাচনের গতিপথকেও অস্থির করে তুলছে।
দেশবাসী তাই আজ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে-তারেক জিয়ার আসল বাধা কোথায়? অদৃশ্য কোন সমীকরণ তাঁকে দেশে ফেরার পথ থেকে সরিয়ে রেখেছে? এই রহস্যের সমাধানই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী অধ্যায়।
Comments