প্রসঙ্গ: এনবিআর বিলুপ্তির মধ্যরাতের অধ্যাদেশ
রাজস্ব খাত সংস্কার নিয়ে এক অধ্যাদেশকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ১২ দিন পর সরকারের আশ্বাসে কর্মবিরতি স্থগিত করে কাজে ফিরেছেন রাজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গত সোমবার তারা কাজে যোগ দেন। অর্থ বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে রাজস্ব বিভাগের এই অচলাবস্থা রাজস্ব আহরণে বড় প্রভাব ফেলেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন অতি গোপনীয়তায় মধ্যরাতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করার অধ্যাদেশ জারি করা হলো। একথা সবাই জানে যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। একটি দেশ যখন অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশের মাধ্যমে তার বাজেটের বৃহৎ অংশ সংস্থান করতে পারে তখন সেই দেশ পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে অনেক সমালোচনা হলেও যথেষ্ট পরিমাণ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ না পেয়েও এনবিআর সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্বের যোগান দিয়ে আসছে। সব সময় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলে তার একটি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। কেবল দাতা সংস্থার পরামর্শে এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসবে কিনা সেটি অংশীজনের সাথে ঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি বলেই প্রতীয়মাণ হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১০০ বছরের পুরাতন প্রতিষ্ঠান। একই আদলে পাকিস্তান এবং ভারতে রাজস্ব এজেন্সি কাজ করছে। দাতা সংস্থার পরামর্শ সেখানে কাজ করে না। এই দুটি দেশের রাজস্ব এজেন্সি তাদের কার্যক্রম সুচারুভাবে পালন করে আসছে। অথচ বাংলাদেশে আকস্মিকভাবে এটি দিখণ্ডিত করে নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদা করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশ জারির পূর্বে এ সংক্রান্ত গঠিত পরামর্শক কমিটির সুপারিশ কে আমলে নেওয়া হয়নি বলেও আভিযোগ আছে। দেশের সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ীগোষ্ঠী, কর আইনজীবী এবং কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ আলোচনা করা হয়নি। নি:সন্দেহে এই গোপনীয়তা প্রত্যাশিত নয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই অধ্যাদেশ বাতিল এর জন্য যখন ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুললে, একপর্যায়ে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বৈঠক করে। সেই বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টার আচরণ সন্তোষজনক ছিল না বলে জানা গেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেও তিনি বলেছেন, তারা আন্দোলন করলে তার কিছু যায় আসে না।
বর্তমান অন্তবর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের মাধমে গঠিত সরকার। বৈষম্য নিরসনের সরকার। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে পেশাদারিত্বকে পাশ কাটিয়ে দুটি ক্যাডারের প্রতি চরম বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এখানেই বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শ কাতর হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে অচল করে তো অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া যায় না। এ বিষয়ে সরকারের ভাবা প্রয়োজন ছিল। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যাটি অনেক আগেই সমাধান করা উচিত ছিল। জুন মাসে রাজস্ব আদায়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাস। অন্যমাসের তুলনায় এই মাসে রাজস্ব আদায় অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অথচ এই মাসে এরকম একটি আন্দোলনের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসন স্থবির হয়ে পড়ে।
প্রত্যেকটি দেশে তাদের রাজস্ব এজেন্সি সরকারের মূল কাঠামো থেকে একটু ভিন্ন থাকে। পাকিস্তানের ফেডারেল ব্যুরো অব রেভিনিউ - এফবিআর, ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাকসেস - সিবিডিটি এবং সেন্ট্রাল বোর্ড অব ইনডাইরেক্ট ট্যাকসেস এন্ড কাইস্টম্স- সিবিআইসি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভিন্নভাবে কাজ করে। এই দুটি সংস্থাতেই পেশাজীবী কর এবং শুল্ক কর্মকর্তারা কর্মরত আছেন। অন্য কোন গোষ্ঠী দ্বারা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয় না। দুটি দেশেই রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বোর্ড মডেলে পরিচালিত হয়। অথচ আমাদের দেশে তড়িঘড়ি করে হঠাৎ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভেঙে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগে কেন পরিণত করতে হলো তা পরিষ্কার নয়।
আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা তিনটি মূল আইন—আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্ক আইন—বোর্ড মডেল দ্বারা বিন্যস্ত। মন্ত্রণালয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার এখতিয়ার সচিবের। এখানে একজন কর্মকর্তা তার কাছে উপস্থাপিত কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। অথচ বোর্ড মডেলে সকল মেম্বার এবং চেয়ারম্যান সহ একটি বিষয়ের উপর আলোচনা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অর্থাৎ সকলের মিলিত পর্যালোচনার মাধ্যমে যে কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মনে রাখা প্রয়োজন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে কোন সিদ্ধান্ত সেটি করহার পরিবর্তন বা অন্যান্য কর সংক্রান্ত যেকোন বিষয় লক্ষ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে স্পর্শ করে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত একক ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি কোথাও। হঠাৎ করে ডিভিশন মডেলে গেলে পুরো রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। যার ফলশ্রুতিতে রাজস্ব আদায় বিপর্যস্ত হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে নীতি প্রণয়ন করা হয় আর এর অধীনস্থ কমিশনারেটগুলো তা বাস্তবায়ন করে। এখানে নীতি প্রণয়নকারী সংস্থা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা আলাদাই আছে। তাহলে পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে ভেঙে ফেলার আগে সরকারের দিক থেকে অনেক প্রশ্নের উত্তর আসা প্রয়োজন।
Comments