ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের পর জ্ঞান ফিরেছে ক্রিস্টা পাইকের, চিকিৎসকদের ভাষ্যে এটি ‘নজিরবিহীন’
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন আসামি ক্রিস্টা পাইক। বর্তমানে তিনি কথা বলতে পারছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পাইকের আইনজীবীরা জানান, ৫০ বছর বয়সী এই নারী বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাতকড়া পরানো অবস্থায় গুরুতর শারীরিক পরিস্থিতিতে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চলছে।
রোমহর্ষক সেই হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস
১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে সংঘটিত হওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দণ্ডিত হন ক্রিস্টা পাইক। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। তৎকালীন ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক ও আরেক সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কোলিন স্লেমারকে একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যান। সেখানে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে স্লেমারকে হত্যা করা হয়।
নক্সভিলের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তাঁরা সবাই সহপাঠী ছিলেন। বিচারিক আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে ভুক্তভোগী স্লেমারের সম্পর্ক রয়েছে—এমন সন্দেহ থেকে পাইক তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন।
সে সময় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে আসে, মৃত্যুর পর ভুক্তভোগীর বুকে পেন্টাগ্রামের আকৃতি খোদাই করা হয়েছিল এবং তাঁর মাথার খুলির একটি অংশ স্মারক হিসেবে সংগ্রহ করেছিলেন আসামিরা।
আইনগত প্রক্রিয়ায় পাইক ও শিপ উভয়েই অপরাধ স্বীকার করেন। ১৯৯৬ সালে আদালত তাঁদের ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও শিপ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান এবং পরে প্যারোলের সুযোগ পান। অন্যদিকে, ঘটনার সময় ১৮ বছর বয়সী অন্য সহযোগী শ্যাডোলা পিটারসন পাহারায় থাকলেও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ায় তাঁকে প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নাটকীয় ব্যর্থতা
গত বুধবার টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু দুই দফা ইনজেকশন দেওয়ার পরও তাঁর মৃত্যু না হওয়ায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। টানা কয়েক দিন অচেতন থাকার পর চিকিৎসকরা তাঁর শরীর থেকে প্রবেশ করা রাসায়নিক পদার্থ অপসারণের চেষ্টা চালিয়ে যান।
বিশেষজ্ঞ ও পাইকের আইনজীবীদের মতে, এই ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি হিসেবে সম্ভবত তিনিই একমাত্র নজির। তবে তাঁর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। আইনজীবীদের ধারণা, তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে নিবিড় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ফোর্ডহাম ল স্কুলের ক্রিমিনোলজির অধ্যাপক ডেবোরা ডেন্নো বিবিসিকে জানান, পাইকের জ্ঞান ফেরা এবং কথা বলতে পারার বিষয়টি তাঁকে 'সম্পূর্ণভাবে বিস্মিত' করেছে। তাঁর মতে, এর আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতির সময় বন্দি বেঁচে যাওয়ার সাতটি ঘটনা ঘটলেও সেগুলোতে জল্লাদরা বন্দির শিরায় কোনো ওষুধ বা বিষ প্রয়োগ করতেই পারেননি।
কিন্তু ক্রিস্টা পাইকের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ডেন্নোর ভাষ্যমতে, 'এখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়মমাফিক যা যা করার কথা, কর্তৃপক্ষ তার সবই করেছিল; অথচ পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত কাজ করেনি। এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।'
Comments