হুতিরা ফোন করে বলেছে, তারা সংঘাত চায় না: দাবি ট্রাম্পের
ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্যমতে, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, হুতিরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং সরাসরি জানিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াইয়ে যেতে আগ্রহী নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এদিকে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে সাম্প্রতিক হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, হামলার পেছনে ইরানের জড়িত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
হামলার পর সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, তাঁর ধারণা অনুযায়ী হামলার জন্য ইরানই সম্ভবত দায়ী। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। সৌদি যুবরাজকে নিজের 'ভালো বন্ধু' বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ভিন্ন। রিয়াদ জানিয়েছে, হামলাটি ইরান থেকে নয়, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে উৎক্ষেপণ করা কয়েকটি ড্রোনের মাধ্যমে হয়েছে। হামলায় হতাহতের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। এর মাধ্যমে ইরাক সরকারকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে নিজেদের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, স্থাপনা ও জনগণকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করছে।
ইরাক সরকারও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে তদন্তের পর হামলাটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। এরপর একজন সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
ইরাকের দুটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করেছে ইরাক। একই সঙ্গে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বড় ধরনের অভিযান চলছে।
লোহিত সাগরের উপকূলে হুতিদের অগ্রগতি
এরই মধ্যে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বেশ কিছু এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহে ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের পর তারা উপকূলীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নেয়। এর আগে তিনটি কৌশলগত দ্বীপও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে তারা।
এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের প্রভাব আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের তেল পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারকদের বিকল্প রুটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবও এ ক্ষেত্রে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের ওপর বেশি নির্ভর করছে।
ট্রাম্পের দাবি, হুতিরা অধিকাংশ জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। তবে একটি নির্দিষ্ট দেশের জাহাজ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পকে দুইবার ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধে সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতি গোষ্ঠী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে খবর এসেছে।
মোখায় সরকারি বাহিনীর হামলা
অন্যদিকে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখায় হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোখা বন্দরের আশপাশে হুতিদের কয়েকটি যান ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। হামলায় কয়েকজন হুতি সদস্য নিহত হওয়ার দাবিও করেছে সরকারি বাহিনী।
সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল নাজিলির ভাষ্য অনুযায়ী, মোখা-ধুবাব সড়কেও হুতিদের যান ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে। এলাকাটি মোখা শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে।
এর আগের দিনও মোখায় গোলাবর্ষণের কথা জানিয়েছিল সরকারি বাহিনী। পাশাপাশি তাইজ-মোখা ও মোখা-ধুবাব সড়ক ব্যবহার না করার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়।
হুতিদের অভিযানের পর মোখা থেকে বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এডেনের দিকে চলে গেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেন।
হুতি সমর্থিত গণমাধ্যমের দাবি, সৌদি বাহিনী মোখা বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে আরও বলা হয়েছে, শহরের সমুদ্রবন্দরে অজ্ঞাত উৎস থেকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
সংঘাতে নিহত ৫০০ ছাড়িয়েছে
গত সপ্তাহে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে উভয় পক্ষের সূত্র অনুযায়ী ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার হিসাবে, সংঘাতের কারণে প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। চলমান সংঘাতকে সেই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধেরই নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হুতিদের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের উপকূলে আরও অগ্রসর হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে হামলার জবাব হামলার মাধ্যমে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
একই সঙ্গে হুতিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের কোম্পানির জাহাজের জন্য সমুদ্রপথ নিরাপদ থাকবে।
তেলের বাজারেও উদ্বেগ
ইয়েমেন ও সৌদি আরবকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিদের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। এতে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় তেহরানের কৌশলগত প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জুলাইয়ে অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরের বিভিন্ন তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে আসছে হুতিরা।
হুতিদের বক্তব্য, ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও চাপের জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, মোখা দখল ঠেকাতে সৌদি বিমানবাহিনীর বড় ধরনের অভিযান না চালানো তাদের বিস্মিত করেছে। তাঁর দাবি, বড় আকারের বিমান অভিযান চালানোর বিষয়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অনুমোদন পায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও হুতিদের অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচল কমেছে
২০২৩ সালের শেষ দিকে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরুর পর থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হুতিরা তখন থেকে বিভিন্ন জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
চলতি বছর হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বাব আল-মান্দেব ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। তবে হুতিদের নতুন হুমকির কারণে সেই রুটে জাহাজ চলাচল আবারও কমেছে বলে জানিয়েছে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স।
ফলে সৌদি আরবকে তেল পরিবহনের জন্য আরও বিকল্প পথের কথা ভাবতে হচ্ছে। লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল দিয়ে ভূমধ্যসাগরে তেল পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুয়েজ খাল অথবা মিসরের একটি পাইপলাইন ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছে। এতে এশিয়ার বাজারে তেল পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
তবে বিকল্প এই রুটও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। আগস্টের শেষ দিকে লোহিত সাগরের উত্তর অংশে একটি সৌদি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
Comments