ট্রাম্পের চাপ বনাম জ্বালানি বাস্তবতা: রাশিয়া ছাড়লে ভারতের খরচ বাড়বে বিলিয়ন ডলারে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, নতুন বাণিজ্যচুক্তির অংশ হিসেবে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাবে বা বন্ধ করবে এবং এর বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়াবে। এর বিনিময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে ভারত সরকার বা রাশিয়া—কেউই প্রকাশ্যে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্য থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া বড় ছাড়ে তেল বিক্রি শুরু করলে ভারত দ্রুত সেই সুযোগ নেয়। যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেলের মাত্র আড়াই শতাংশ রাশিয়া থেকে এলেও এখন তা প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করে ভারত। এই সস্তা তেল ভারতীয় শোধনাগারগুলোকে ভালো মুনাফা করতে সাহায্য করেছে এবং দেশের জ্বালানি মূল্য তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ফলে হঠাৎ রুশ তেল বন্ধ করলে জ্বালানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় চাপ পড়তে পারে।
ভেনেজুয়েলাকে বিকল্প হিসেবে ভাবা হলেও সেটিও সহজ সমাধান নয়। দেশটি ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে হওয়ায় পরিবহন খরচ বেশি, আর তাদের তেলে রাশিয়ার মতো বড় ছাড়ও নেই। উপরন্তু ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত, যা পরিশোধনের জন্য বিশেষ সক্ষমতা দরকার—ভারতের সব শোধনাগারে সেই সুবিধা নেই। অনেক ক্ষেত্রে এই তেল হালকা তেলের সঙ্গে মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, ফলে খরচ আরও বাড়ে। তাছাড়া ভেনেজুয়েলার মোট উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেলের মধ্যে সীমিত, যা ভারতের রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত তেলের সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।
আরও একটি বড় বিষয় হলো নায়ারা এনার্জি, যার মালিকানার বড় অংশ রাশিয়ার রসনেফটের হাতে এবং যা রুশ তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ ধরনের কাঠামোগত নির্ভরতা ভারতের জন্য দ্রুত রুশ তেল ত্যাগ করা কঠিন করে তোলে। বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে পুরোপুরি সরে গেলে ভারতের বছরে ৯ থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারত কিছুটা উৎস বৈচিত্র্য করছে—মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াচ্ছে—তবে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় হঠাৎ করে রাশিয়ার তেল পুরোপুরি বাদ দেওয়া কঠিন। ভেনেজুয়েলার তেল আংশিক বিকল্প হতে পারে, কিন্তু তা রুশ তেলের জায়গা পুরোপুরি নিতে পারবে না এবং এতে ভারতের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
Comments