‘মিয়ানমারে প্রত্যাবসনই রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধান’
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারেই প্রত্যাবাসনই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ বলে মন্তব্য করেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (যুগ্ম সচিব) আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ।
তিনি রাজধানীর উত্তরায় সিমেক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যাম্পাস–২)-এ শনিবার অনুষ্ঠিত 'রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে টেকসই সমাধান: নীতি ও প্রয়োগ'- শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন।
সিমেক রিসার্চ সেন্টার, সিঙ্গাপুর এবং সিমেক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও ভারতের গবেষক, নীতিনির্ধারক, মানবিক সহায়তা কর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এই সম্মেলনে স্বল্পমেয়াদি মানবিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন সিমেক রিসার্চ সেন্টার, সিঙ্গাপুরের পরিচালক ড. রতন কুমার রায় ও সূচনা বক্তব্য দেন সিমেক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ড. শরিফুল ইসলাম।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ আরও বলেন, বাংলাদেশ স্থানীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের একীভূত করতে সক্ষম নয় এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে হয়েছে। এখন পর্যন্ত মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা তৃতীয় দেশে পুনর্বাসিত হয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে অভিবাসন ও শরণার্থী-বিরোধী মনোভাব বাড়ায় ভবিষ্যতে এই সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রচলিত তিনটি সমাধান প্রত্যাবাসন, স্থানীয় একীভূতকরণ ও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের মধ্যে বর্তমান বাস্তবতায় কেবল প্রত্যাবাসনই টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদিও মিয়ানমারের পরিস্থিতির কারণে তা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল মানবিক ইস্যু নয়; এটি একটি রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে, যার সমাধানে গবেষণা, নীতি সংলাপ ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি অপরিহার্য।
সম্মেলনে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরার দৃঢ় আকাঙ্ক্ষার কথা জানান। তারা নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমে সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরেন।
ডিজিটাল হস্তক্ষেপ ও টেকসই সমাধান বিষয়ক প্লেনারি সেশনে বক্তব্য দেন ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের সহকারী প্রতিনিধি (প্রটেকশন) অ্যাস্ট্রিড ক্যাসটেলেইন। তিনি বলেন, ডিজিটাল ও বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শুধু মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের মধ্যে ২০১৮ সাল থেকে যৌথ সমঝোতা স্মারকের আওতায় রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বিচ্ছিন্ন মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংকট হিসেবে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে।
সমাপনী অধিবেশনের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সম্মেলনের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান সিমেক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিঃ সরদার মো. শাহীন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করেছে। এ সংকটের টেকসই সমাধানে দেশের একাডেমিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণমূলক আলোচনায় যুক্ত থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের সিমেক ফাউন্ডেশনের পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া এ সমম্মেলনে দুটি প্লেনারি সেশন, সাতটি বিষয়ভিত্তিক সেশন, একাডেমিক প্রকাশনা নিয়ে একটি বিশেষ অধিবেশন এবং সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের সহযোগী পৃষ্ঠপোষক ছিলো সিঙ্গাপুরভিত্তিক জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনাউয়ার ফাউন্ডেশন।
Comments