ভুয়া মানবাধিকার সংগঠনের আড়ালে ব্ল্যাকমেইলিং: প্রকাশ্যে এলো ‘পঞ্চম শ্রেণি পাস’ সামস চক্রের জালিয়াতির সাম্রাজ্য
মানবাধিকারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের আড়ালে অপপ্রচার, ভুয়া সংবাদ সম্মেলন আর ব্ল্যাকমেইলিংকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এক সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতা সুফি সাগর সামস। 'আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশন' নামের নামসর্বস্ব সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই প্রতারকের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র পঞ্চম শ্রেণি। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের নির্যাতন, জেল-জুলুমের ভয় দেখানো, এমনকি মানবপাচার ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধে সক্রিয় ছিল চক্রটি।
পুলিশের তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, নামের শুরুতে ভুয়া 'ডক্টর' পদবি যুক্ত করে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতেন সামস। আমেরিকার একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে নিজেকে 'ডক্টরেটধারী' দাবি করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনহীন 'বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি' (বিএইচপি) নামের একটি ভুয়া দলের মহাসচিব পরিচয়েও ঘুরে বেড়াতেন তিনি। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে কোনো ব্যক্তির নামে ভুয়া তথ্য জোগাড় করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মিথ্যা অভিযোগের চিঠি পাঠানো এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করাই ছিল তাদের মূল কৌশল।
পূর্বে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়াহেদের কাছে চাঁদা দাবি এবং পরবর্তীতে ভুয়া অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের হাতে সুফি সাগর সামস গ্রেফতার হন। সেই সময় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সামস তার জালিয়াতির কথা স্বীকার করেন। এছাড়া অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বা লোক পাঠানোর নাম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আমেরিকান অ্যাম্বেসির দায়ের করা মামলাসহ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর কিছুদিন নীরব থাকলেও ২০২৬ সালে এসে আবারও একই কায়দায় মাঠে নেমেছে এই সিন্ডিকেট। চক্রটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দুদক ও প্রশাসনিক দপ্তরে ভুয়া ও মিথ্যা অভিযোগ জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি অব্যাহত রেখেছে। সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের দোসর হিসেবে দীর্ঘদিন ফায়দা লুটার পর বর্তমানে নতুন করে এই ব্ল্যাকমেইলিং বাণিজ্য চালু করায় ক্ষোভ বাড়ছে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক মহলে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি হামলা এবং বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অর্থ যোগানদাতা হিসেবেও নাম এসেছে এই চক্রের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড কাজী মনসুরুল হকসহ অন্য সদস্যদের। ভুক্তভোগীদের দাবি, মানবাধিকার ও রাজনীতির ভুয়া সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কর্পোরেট খাত ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা সুফি সাগর সামস এবং কাজী মনসুরুল হকের মতো অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
Comments