হুতিদের নিয়ন্ত্রণে বাব আল-মানদেব, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ?
ইয়েমেনের কৌশলগত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে।
শুক্রবার হুতিরা বাব আল-মানদেবের মাঝামাঝি অবস্থিত মায়ুন দ্বীপে প্রবেশ করে। এর আগে প্রণালির ইয়েমেন অংশের কাছে থাকা ধুবাব উপকূলীয় এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখার নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী মায়ুন থেকে সরে যাওয়ার পর সেখানে অবস্থান নেয় হুতিরা।
এর ফলে বাব আল-মানদেবের দুই নৌপথের মাঝখানে থাকা গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে যায়। একই সময়ে ইয়েমেনের বিস্তৃত লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পাশাপাশি হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও অগ্রসর হয়েছে হুতিরা। অন্যদিকে হারানো অঞ্চল উদ্ধারে পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব?
বাব আল-মানদেবের আরবি অর্থ 'অশ্রুর ফটক'। প্রায় ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রণালি ইয়েমেনকে আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়া থেকে পৃথক করেছে। এর দক্ষিণ দিকে রয়েছে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগর, আর উত্তরে লোহিত সাগর। লোহিত সাগর পেরিয়ে সুয়েজ খালে যাওয়ার অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথও এটি।
এই কারণে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাব আল-মানদেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস পরিবহনে এই জলপথের ভূমিকা বড়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশের সমপরিমাণ পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন হয়েছে।
একই রুট দিয়ে বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের দিকে যায়। ফলে বাব আল-মানদেবে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সুয়েজ খাল, এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হুতিদের নিয়ন্ত্রণে কী বদলাতে পারে?
বাব আল-মানদেবের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে মানেই সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়। হুতিরা দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে তারা বাধা দেবে না এবং তাদের অবরোধের লক্ষ্য মূলত সৌদি জাহাজ।
তবে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা গেছে লোহিত সাগরের নৌপথে।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব এলাকায় বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানানোর অংশ হিসেবেই এসব হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল তারা।
হামলার পর বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় শিপিং কোম্পানি সুয়েজ খালের পথ এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ হয়ে ইউরোপ-এশিয়া রুটে চলাচল শুরু করে। এতে সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব ও সময় দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বাড়ছে পরিবহন ব্যয়
আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ চলাচল করলে গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়তি জ্বালানি, বিমা, ক্রু ও পরিচালন ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এসব অতিরিক্ত খরচের প্রভাব পড়ে পণ্য আমদানিকারক, উৎপাদক এবং ভোক্তাদের ওপর।
বাব আল-মানদেবে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে নতুন করে রুট পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব এবং পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
এপি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থাও নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তেলের বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
বাব আল-মানদেব সংকটের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্ব তেল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রুট ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছিল।
কিন্তু বাব আল-মানদেবেও যদি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের বিকল্প পথগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতেও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়লে জ্বালানি সরবরাহে আরও বড় চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চাপে পড়তে পারে সুয়েজ খাল
বাব আল-মানদেবের অন্যতম বড় কৌশলগত গুরুত্ব হলো—এটি সুয়েজ খালের দক্ষিণ প্রবেশপথ। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে আফ্রিকা ঘুরে যাওয়ার তুলনায় কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ কমে যায়।
কিন্তু বাব আল-মানদেবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে শিপিং কোম্পানিগুলো দীর্ঘ হলেও তুলনামূলক নিরাপদ কেপ অব গুড হোপ রুট বেছে নিতে পারে। এতে শুধু জ্বালানি নয়, কনটেইনার, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যের সরবরাহেও বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৩-২৪ সালে হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগরে যে ধরনের নৌ-সংকট তৈরি হয়েছিল, এবার পরিস্থিতি তার চেয়েও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের জন্যও কৌশলগত সুবিধা
বাব আল-মানদেবে হুতিদের সামরিক প্রভাব বাড়া ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। আরব উপদ্বীপের একদিকে হরমুজ প্রণালি এবং অন্যদিকে বাব আল-মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেই যদি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি পরিবহনের ওপর তেহরানের পরোক্ষ চাপ বাড়তে পারে।
তবে ইরান সরাসরি হুতিদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে—এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ মনে করে, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা হুতিদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি
হুতিদের দ্রুত অগ্রগতিতে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বেড়েছে। জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেছেন, দেশটি আরও বিপজ্জনক একটি পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। সৌদি আরবও হুতিদের অগ্রগতিকে বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক অভিযানের পরিবর্তে গোয়েন্দা সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
শুধু ইয়েমেন নয়, প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে
বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণকে এখন আর শুধু ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই জলপথের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে।
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মানদেবেও যদি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যে পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, পণ্যের মূল্য এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপরও।
ফলে ইয়েমেনের উপকূলে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির বিষয় নয়; বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও এটি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঝুঁকির সংকেত।
সূত্র: এপি, দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স
Comments