পুলিশি নিষ্ক্রিয়তায় সাহস বেড়েছে ছিনতাইকারীদের
রাজধানীতে এখন ঘর থেকে বের হওয়াই যেন এক ধরনের ঝুঁকি। যানজট,দূষণ,সড়ক দুর্ঘটনা-এসবের সঙ্গে নাগরিকদের নতুন করে যুক্ত হয়েছে ছিনতাইয়ের আতঙ্ক। যে শহরে মানুষ জীবিকা, শিক্ষা,চিকিৎসা কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে প্রতিদিন রাস্তায় বের হন,সেই শহরের রাস্তাই যদি মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে,তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- এ শহরে বাঁচবো কেমন করে?
শনিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকার সামনে রিকশা থেকে ছিনতাইকারীর টানে পড়ে প্রাণ হারালেন একজন প্রধান শিক্ষিকা। চিকিৎসা নিতে গ্রাম থেকে সকালে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। জীবনের নিরাপত্তার তাগিদেই হয়তো চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই পথের মাঝখানে থেমে গেল তাঁর জীবনযাত্রা।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কয়েক দিন আগেই আসাদ গেটে একই কায়দায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন একজন মা। গত ছয় মাসে চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় ঢাকায় তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনটি ঘটনাতেই প্রায় একই কৌশল-চলন্ত যানবাহনের পাশ বা পেছন থেকে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দিয়েছে, আর ব্যাগের সঙ্গে যাত্রী ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলোকে কেবল 'ছিনতাই' বলে দায় সেরে ফেলার সুযোগ নেই। কারণ এটি এখন সরাসরি জীবনের নিরাপত্তার সংকট। একজন মানুষের হাতে থাকা ব্যাগ বা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে গিয়ে যদি তাকে চলন্ত রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি নিছক সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া নয়; বরং মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।
ছিনতাই এখন আর রাতের অপরাধ নয়। একসময় রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সঙ্গে ভোর,গভীর রাত, নির্জন সড়ক কিংবা একা পথচারীর ধারণা জড়িত ছিল। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। সকাল থেকে রাত, প্রায় সব সময়েই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ব্যস্ত সড়ক,জনবহুল এলাকা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও যেন অপরাধীদের থামাতে পারছে না।
আর অপরাধের ধরনও হয়েছে ভয়ংকর। আগে ছিনতাইকারীরা অস্ত্র দেখিয়ে টাকা পয়সা বা মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে পালিয়ে যেত। এখন কুপিয়ে,ছুরিকাঘাত করে,গুলি করে,চলন্ত অবস্থায় ফেলে দিয়ে কিংবা অস্ত্রের মুখে মানুষকে জিম্মি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ ছিনতাইকারীদের কাছে মানুষের জীবন এখন তুচ্ছ। কয়েক হাজার টাকা,একটি মোবাইল ফোন বা একটি ব্যাগের জন্যও তারা মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করছে না।
প্রকৃত ছিনতাইয়ের হিসাব কোথায়? রাজধানীতে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি এবং ডাকাতির মামলা হয়েছে মাত্র ১৮টি। কিন্তু এই সংখ্যা দিয়ে ঢাকার প্রকৃত ছিনতাইয়ের চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কারণ ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া মানুষের বড় একটি অংশ থানায় মামলা করতে যান না। কেউ সময়ের অভাবে, কেউ পুলিশের ঝামেলা এড়াতে, আবার কেউ মামলা করে আদৌ কোনো ফল হবে কি না-এই সন্দেহে চুপ থাকেন। এমন অভিযোগও রয়েছে, থানায় গিয়ে অনেক সময় মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নেওয়া হয়।
ফলে সরকারি হিসাবের খাতায় অপরাধের সংখ্যা সীমিত থাকলেও বাস্তবের রাস্তায় অপরাধের বিস্তার থেকে যায় অদৃশ্য। এই অদৃশ্য অপরাধই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ যে অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান নেই, তার বিরুদ্ধে কার্যকর পরিকল্পনাও করা কঠিন।
পুলিশ জানে,তবু নিরাপত্তা কোথায়? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে। বিভিন্ন সময়ে তিন শতাধিক স্থানকে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক এলাকায় ছিনতাই বেশি হয় বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ অপরাধীরা কোথায় সক্রিয়,কোন জায়গাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ-পুলিশের তা জানা আছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো,সেসব এলাকায় টহল কোথায়? যদি একটি এলাকা বারবার ছিনতাইয়ের জন্য চিহ্নিত হয়, তাহলে সেখানে বাড়তি পুলিশি নজরদারি থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। নির্দিষ্ট সময়ে টহল বাড়ানো হবে,গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তল্লাশিচৌকি থাকবে,সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি থাকবে, সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। পুলিশি এই নিষ্ক্রীয়তা প্রকারান্তরে কনফিডেন্স বাড়িয়ে দিচ্ছে ছিনতাইকারীদের।
নগরবাসীর অভিযোগ,আগের তুলনায় পুলিশের তল্লাশিচৌকি কমে গেছে। কোথাও চৌকি থাকলেও অনেক সময় সেখানে পুলিশ সদস্যদের দেখা যায় না। আবার কোথাও দায়িত্বে থাকা সদস্যরা সড়কের নিরাপত্তার পরিবর্তে মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকেন-এমন অভিযোগও রয়েছে।
যদি এমন পরিস্থিতি সত্যিই থেকে থাকে,তাহলে তা শুধু দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা নয়;অপরাধীদের জন্য এক ধরনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
নিরাপত্তা কি শুধু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য? জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এমন ঘটনা ঘটার বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবনার। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে যদি একজন সাধারণ নাগরিক ছিনতাইকারীর শিকার হয়ে প্রাণ হারান,তাহলে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নিরাপত্তা মানে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ভবন পাহারা দেওয়া নয়। নিরাপত্তার প্রকৃত অর্থ হলো-সাধারণ মানুষ যেন রাস্তায় হাঁটতে পারেন,রিকশায় যেতে পারেন, গণপরিবহনে উঠতে পারেন এবং দিনের শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।
একজন মা,একজন শিক্ষক,একজন কর্মজীবী নারী কিংবা একজন শিক্ষার্থী-কেউই যেন ব্যাগ হাতে রাস্তায় বের হয়ে ছিনতাইকারীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হন,সেটিই একটি নিরাপদ নগরের মাপকাঠি।
আতঙ্কের শহর কি স্বাভাবিক শহর? কর্মজীবী মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বাসা থেকে অফিসে,অফিস থেকে বাসায় রিকশায় যাতায়াত করেছেন। আগে হয়তো ছিনতাইয়ের আশঙ্কা ছিল,কিন্তু সেই ভয় ছিল সীমিত। এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সন্ধ্যা নামলেই অনেক পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। নারী রিকশায় উঠলে ব্যাগ কোথায় রাখবেন,ফোন কখন বের করবেন,কোন রাস্তা দিয়ে যাবেন-এসব নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। পেছন থেকে কোনো মোটরসাইকেল বা বাইসাইকেল আসছে কি না,পাশে কেউ ব্যাগ টান দেবে কি না-এই আতঙ্ক নাগরিক জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
এভাবে কোনো মহানগর চলতে পারে না। একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন,প্রশস্ত সড়ক,ফ্লাইওভার কিংবা মেট্রোরেল দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একজন সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারেন-সেটিও নগর উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এ কারণে দরকার দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ। ছিনতাই বন্ধে শুধু অপরাধী গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান প্রকাশ করলে হবে না। অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত ও দৃশ্যমান পুলিশি টহল বাড়াতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে কার্যকর তল্লাশিচৌকি নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম তদারক করতে হবে। সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোর ফুটেজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে অপরাধী শনাক্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ভুক্তভোগী মামলা করতে গেলে তাকে নিরুৎসাহিত করা বা মামলা না নিয়ে শুধু জিডি করে দায় শেষ করার সংস্কৃতি থাকলে প্রকৃত অপরাধের চিত্র কখনোই সামনে আসবে না।
প্রয়োজনে ছিনতাইয়ের জন্য আলাদা ডেটাবেজ তৈরি করে কোন এলাকায়,কোন সময়ে,কী ধরনের ছিনতাই হচ্ছে—তার বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশি টহল ও নজরদারির পরিকল্পনা করতে হবে।
একটি ব্যাগ,একটি মোবাইল ফোন কিংবা কিছু টাকা কখনোই একটি মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়। কিন্তু রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যেন উল্টো বাস্তবতার কথাই বলছে-ছিনতাইকারীরা মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখছে, আর নাগরিকরা নিরাপত্তার জন্য প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো,অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধপ্রবণ এলাকা সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকেই জানে। কোথায় ছিনতাই বেশি হয়,কীভাবে ছিনতাই হয়, তারও ধারণা রয়েছে। তারপরও যদি একই জায়গায় বারবার মানুষ প্রাণ হারান,তাহলে শুধু ছিনতাইকারীদের দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রশ্ন উঠবেই, যেখানে পুলিশ জানে অপরাধ হবে,সেখানে অপরাধ ঠেকানোর ব্যবস্থা কেন থাকবে না? নগরবাসী পুলিশের কাছে বিশেষ কোনো সুবিধা চায় না। তারা শুধু চায়,ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে। এই প্রত্যাশা কোনো অনুগ্রহ নয়;এটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার।
তাই এখন সময় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটার পর শুধু মামলা ও গ্রেপ্তারের হিসাব দেওয়ার নয়। সময় এসেছে ছিনতাই প্রতিরোধে দৃশ্যমান,নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার।
মানুষকে যদি প্রতিদিন রাস্তায় বের হওয়ার আগে ভাবতে হয়-আজ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারব তো? তাহলে সেই শহরকে নিরাপদ রাজধানী বলা কঠিন।
রাজধানীর মানুষ আতঙ্ক নয়,নিরাপত্তা চায়। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের-আজ এবং এখনই।
Comments