তিব্বতের ভয়াবহ বন্যা: ভিডিও নেই, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও অজানা
তিব্বতের গিরং বন্দরে ভয়াবহ বন্যার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দুর্যোগের পুরো চিত্র খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও প্রকাশ্যে আসছে না। ফলে তিব্বতে আসলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবল স্রোতে একটি সাদা ভবন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। সেখানে থাকা লোকজন জীবন বাঁচাতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও চীনের নিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেটি সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
গত বুধবারের বন্যায় তিব্বতে হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে চীনা কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও উদ্ধার কার্যক্রমে সমন্বয়ের জন্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। তবে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের বিস্তারিত তথ্য এখনও সীমিত।
তিব্বতের ওপর চীনা সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৯৫০-এর দশক থেকে অঞ্চলটি বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিব্বতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। নির্বাসিত আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামাকে চীন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে বিবেচনা করে।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তিব্বতে বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ বা সংকট দেখা দিলে সেখানকার তথ্যপ্রবাহের ওপরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেখা যায় বলে অধিকারকর্মীদের অভিযোগ।
চীনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ ও নিহতদের সংখ্যা, উদ্ধার অভিযান এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে কিছু তথ্য প্রকাশ করছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সরাসরি বক্তব্য কিংবা দুর্যোগের সময় ধারণ করা সাধারণ মানুষের ভিডিও খুব কমই বাইরে আসছে।
বিবিসির সাংবাদিক লরা বিকার জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের তিব্বতে কাজ করার ক্ষেত্রে আগে থেকেই নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারের অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা যায় না। ফলে কোনো বড় দুর্যোগের সময় স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে অনেকাংশে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকারি সম্প্রচারে উদ্ধারকাজ ও প্রশাসনের তৎপরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা বা দুর্যোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলনামূলকভাবে কম উঠে আসছে।
তবে বেইজিং যে পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, এমনটা নয়। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাকে ধ্বংসাবশেষ সরানো ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করতে দেখা গেছে। বড় কোনো দুর্যোগের পর চীনের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার এ ধরনের দ্রুত সফরকে পরিস্থিতির গুরুত্বের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই সময়ে তিব্বতে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় কর্মীদের প্রতি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আস্থা ধরে রাখা এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং দায়িত্বে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহির কথাও বলা হয়েছে।
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, তিব্বতের বাসিন্দারা সরকারের অবস্থানের বিপরীতে সামাজিকমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশ করলে বা বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললে তাদের আটক বা হয়রানির ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে বন্যার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীন তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিব্বত নিয়ে কাজ করা দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বতও চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটির দাবি, সামাজিকমাধ্যম থেকে বন্যার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের বিষয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে তিব্বতিদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ চীন বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। ফলে সাম্প্রতিক বন্যায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি কতটা হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা কী—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
Comments