বাংলাদেশ কি বঙ্গোপসাগর নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক চাপে?
বঙ্গোপসাগর, নামের মধ্যেই এক গভীর ভূরাজনৈতিক অর্থ নিহিত।দক্ষিণ এশিয়ার এই নীল জলরাশি শুধু বাংলাদেশের না, এই অঞ্চলেরঅর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রভাববিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক উপস্থিতি এই বঙ্গোপসাগরকেএক ধরনের কৌশলগত সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত করেছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজস্ব অর্থনৈতিক ওনিরাপত্তা স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে, এই তিন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্মভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ, ভুল এক পদক্ষেপ বাংলাদেশকে শক্তিরপ্রতিযোগিতার ঘূর্ণাবর্তে টেনে নিতে পারে। আবার সঠিক ভারসাম্য রক্ষাকরতে পারলে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে সহযোগিতা ও সমৃদ্ধিরদিগন্ত।
উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন নৌকৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ারমাহান 'দি ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার' (১৮৯৭) শিরোনামে একটি গ্রন্থ লেখেন। এতে তিনি লিখেছেন, সমুদ্রবাণিজ্য বানৌশক্তি যেভাবেই হোক; সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তার পক্ষে পৃথিবীনিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয়সমুদ্রপথে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতে, বঙ্গোপসাগরেখনিজসম্পদের সঠিক আহরণ ও ব্যবহার বাংলাদেশকে আগামী দিনেরএনার্জি সুপারপাওয়ারে পরিণত করবে।
মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগের তথ্যমতে, অগভীর সমুদ্রে ৮দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও সাগরক্ষেত্রের ১০ ও ১১ নং ব্লকের ৫ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুতের কথা জানা যায়। বঙ্গোপসাগরে বিশ্বেরদ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ 'সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড'– যেখানে তিমি, ডলফিন, কচ্ছপসহ বিরল জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজননকেন্দ্র, জীববৈচিত্র্যেরঅন্যতম আধার; বিশাল এই জলভান্ডারে রয়েছে মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য। এখানেও খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়াও ১৩ রকমের খনিজদ্রব্যসহ খনিজ বালুর আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়। প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ টন মাছ আহরণকরে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্বের দীর্ঘতম অখণ্ড সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসমৃদ্ধপ্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত।
বঙ্গোপসাগরে মজুত খনিজ সম্পদের কৌশলগত ব্যবহারের মাধ্যমেবাংলাদেশ শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মৎস্য সম্পদ আহরণও প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বৈদেশিক রপ্তানি আয়েঅবদান রাখতে পারে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পে এক নতুনমাত্রা যোগ করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ৩০ থেকে ৮০ মিটারগভীরতায় এক ধরনের ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সিমেন্ট উৎপাদনেকাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বঙ্গোপসাগরের সীমারেখা শুধুকক্সবাজার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এটা শ্রীলঙ্কার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বেরপ্রায় অর্ধেক পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ এ পথ ব্যবহার করে। সমুদ্রপথে আমাদের প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। বিদেশের সাড়েচার হাজার জাহাজ বাংলাদেশে এই আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনকরে।
সাম্প্রতিক সময়ে, চীন চাইছে বঙ্গোপসাগরে তাদেরসামরিক আধিপত্য বাড়াতে। এর ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশের বিপদ বাড়তে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢালাও ভাবে সব চীনা প্রস্তাবে পা দেওয়াটা দেশের অর্থনীতির পক্ষে বিপজ্জনক। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিকঅবস্থা ভালো নয়। সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার (আইএমএফ) থেকে ৪০০-৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ রয়েছেযুক্তরাষ্ট্রের হাতে। অতিরিক্ত চীন নির্ভরতায় এই ঋণ পেতে অসুবিধা হতে পারে।তাছাড়া চীনা ঋণের ফাঁদেপরে শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো অবস্থা হতে পারে আমাদেরও। প্রতিবেশীদের চটিয়ে চীনকে কৌশলতাদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিলে তা বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হতে পারে।
চীনসমুদ্রে তাদের আধিপত্য বাড়াতে মরিয়া। তাই মিয়ানমারের কিয়াউকপায়ুবন্দর ও পাইপলাইন প্রকল্প, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় বিনিয়োগে উৎসাহী তারা। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের কৌশলগত নির্ভরতা ও ঝুঁকি কমাতে বঙ্গোপসাগর একটি বিকল্প ও সহজসংযোগপথ তৈরি করতে চায় তারা। এই অঞ্চলে চীনের এই কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কৌশলগত উদ্বেগ ও নিরাপত্তা সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।
উপকূলীয় দেশগুলোতে ঋণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে চীন দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও প্রভাব তৈরি করছে। সঙ্গে রয়েছে ভারতমহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আগ্রাসী মনোভাব। তাদের এই কৌশল অবশ্য বহুদিনের। সেই লক্ষ্যে ২০১৬ সালে চিনা প্রেসিডেন্ট শিজিনপিং মাত্র ২২ ঘণ্টার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। চীনের কূটনৈতিক ফাঁদে পা দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। বর্তমান সরকারকেও চীন বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলতে চাইছে। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এখন বঙ্গোপসাগর ঘিরে ভারসাম্য পূর্ণ কৌশল অবলম্বন করছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় বেজিং সফর করেন তারেক রহমান। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠকেচীন মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের (সিএমবিইসি) প্রস্তাবদেয় বেজিং। রোহিঙ্গা সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীন চাপ দিচ্ছে। কিন্তু এই করিডোর তৈরি হলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। আরও বাড়বে চীনের উপর আমাদের নির্ভরতা। দেশের সার্বভৌমত্ব বিঘ্নিত হওয়ারও আশঙ্কা থাকছে। অর্থনৈতিক করিডোরের নামে চীন তাদের সামরিক শক্তির বিকাশ ঘটাতে চায়। সমুদ্রে তারা নিজেদের শক্তি বাড়াতে ব্যবহার করতে চায় বাংলাদেশের সীমানাকে।
বাংলাদেশ সফরে এসে 'ওয়ান-বেল্ট, ওয়ান রোড' কর্মসূচিতে আমাদের সামিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। অবকাঠামোর উন্নয়নের নামে 'ওয়ান-বেল্ট, ওয়ান রোড' আসলে একটি চীনা ফাঁদ। সেই ফাঁদ এখন টের পাচ্ছে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। আগামী দিনে বাংলাদেশকেও এর জন্য ভুগতে হতে পারে। নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে ৬৫টি দেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নামে ২০১৩ সালে বিআরআই প্রকল্পটি হাতে নেন প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। বেশিরভাগ দেশই এখন বুঝতে পারছে বিআরআই কতটা বিপজ্জনক।
চীনা প্রেসিডেন্টের সেই ঢাকা সফরে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেকগুলো বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতা চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। বেসরকারি পর্যায়েও আরও ১৩ টি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির কোনও সুফল আমরা এখনও চোখে দেখতে পারিনি। কিন্তু আমাদের বেড়েছে ঋণ আর সুদের বোঝা।
প্রস্তাবিত সিএমবিইসি অনুযায়ী, চীনের ইউনান থেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক করিডোর। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমাদের মংলা বন্দর পর্যন্ত সরাসরি সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হবে বেজিং। এতে বঙ্গোপসাগরের দরজা চীনের জন্য পুরোদমে খুলে যাবে। ইতিমধ্যেই 'চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডরের (সিএমইসি)' প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
২০১৭ সাল থেকে প্রকট রোহিঙ্গা সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশ। এখন মিয়ানমারের দরোজা পুরোদমে খুলে দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে বলা হয়েছে, চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবস্থাকে যুক্তকরার একটি সম্ভাব্য বহুমাত্রিক সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে থাকবে সড়ক, রেলপথ, নদীপথ, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিক হাব এবং ডিজিটাল সংযোগ। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রস্তাব শুনতে ভালো লাগলেও এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে চীনের শক্তি বিস্তারের পরিকল্পনাও।
বাংলাদেশে দু'টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলবে চীন। ৮০০ একর জমির উপর একটি তৈরি হবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়। দ্বিতীয়টির জন্য মংলা বন্দর সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১১০ একর জমি পাচ্ছে বেজিং। দেশে পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) জাপানকে ছাড়িয়ে গেছে চীন। বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের পুঞ্জীভূত এফডিআই প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে জাপানের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ থেকে ৬০কোটি ডলারের মধ্যে। দেশের আর্থিক বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের জন্যবিদেশি বিনিয়োগ খুবই জরুরি। কিন্তু অতীতে দেখা গিয়েছে চীনা বিনিয়োগে আমাদের কোনও লাভ হয়নি। বরং বেড়েছে ঝুঁকি। চীনা নাগরিকরা একই প্রকল্প থেকে প্রচুর মজুরি ও সুবিধা পেলেও বাংলাদেশিরা বঞ্চিতই থেকে গিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় চীনা সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশীদের সঙ্গে চীনা নাগরিকদের সংঘর্ষও রয়েছে প্রচুর। শ্রমের ক্ষেত্রেও ন্যায্যতার অভাব রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কথাকে মাথায় রেখেই আমাদের চীনা নীতি হওয়া উচিত 'বাংলাদেশ ফার্স্ট'। দেশের স্বার্থকেই দিতে হবে অগ্রাধিকার।
শুধু চীন নয়, অন্যদেশের সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধির স্বার্থে বাংলাদেশের সীমানা ব্যবহার করতে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও পরাজয়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে শুরু করেছে চীনের বন্ধু পাকিস্তান। চীনের তৈরি সাবমেরিন নিয়ে পাকিস্তান ফের প্রবেশ করেছে বঙ্গোপসাগরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের শাসনামলে, গত বছর নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'পিএনএস সাইফ' চট্টগ্রাম বন্দরে চার দিন নোঙর করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজের চট্টগ্রামে নোঙর করাকে 'শুভেচ্ছা সফর' বলে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু পশ্চিমারা এটা ভালো ভাবে নেয়নি। বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় চীনা প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে আপত্তি আছে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভারত মহাসাগর অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বজায় রেখেছে। 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' এবং 'কোয়াড অ্যালায়েন্স'—এই দুই কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে চায়।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক। বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য; বিশেষকরে তৈরি পোশাক শিল্পে মার্কিন বাজার বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়, এটি আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। প্রায় ১১৮,০০০ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা, যেখানে রয়েছে বিশাল মৎস্যসম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, ও নৌ-বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন সমুদ্রপথে হয় এবং তার একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষাকরা। যাতে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য রাষ্ট্রের আস্থায় আঘাত না করে।
বঙ্গোপসাগর আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুযোগ। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন দেশই এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট কিন্তু বাংলাদেশের শক্তি তার নিরপেক্ষতা ও বাস্তববাদী কূটনীতিতে।
বঙ্গোপসাগর—নামের মধ্যেই এক গভীর ভূরাজনৈতিক অর্থ নিহিত। দক্ষিণ এশিয়ার এই নীল জলরাশি শুধু বাংলাদেশের না, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক উপস্থিতি এই বঙ্গোপসাগরকে এক ধরনের কৌশলগত সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত করেছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে, এই তিন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ, ভুল এক পদক্ষেপ বাংলাদেশকে শক্তির প্রতিযোগিতার ঘূর্ণাবর্তে টেনে নিতে পারে। আবার সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির দিগন্ত।
উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন নৌ-কৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ারমাহান 'দি ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার' (১৮৯৭) শিরোনামে একটি গ্রন্থ লেখেন। এতে তিনি লিখেছেন, সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক; সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তার পক্ষে পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতে, বঙ্গোপসাগরে খনিজ সম্পদের সঠিক আহরণ ও ব্যবহার বাংলাদেশকে আগামী দিনের এনার্জি সুপার পাওয়ারে পরিণত করবে।
মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগের তথ্যমতে, অগভীর সমুদ্রে ৮ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও সাগরক্ষেত্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুতের কথা জানা যায়। বঙ্গোপসাগরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ 'সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড'– যেখানে তিমি, ডলফিন, কচ্ছপসহ বিরল জলজ প্রাণির নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র, জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আধার; বিশাল এই জলভান্ডারে রয়েছে মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য। এখানেও খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়াও ১৩ রকমের খনিজ দ্রব্যসহ খনিজ বালুর আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়। প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ টন মাছ আহরণ করে, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্বের দীর্ঘতম অখণ্ড সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সমৃদ্ধ প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত।
বঙ্গোপসাগরে মজুত খনিজ সম্পদের কৌশলগত ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মৎস্য সম্পদ আহরণও প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বৈদেশিক রপ্তানি আয়ে অবদান রাখতে পারে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পে এক নতুনমাত্রা যোগ করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় এক ধরনের ক্লের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সিমেন্ট উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বঙ্গোপসাগরের সীমারেখা শুধু কক্সবাজার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এটা শ্রীলঙ্কার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ এ পথ ব্যবহার করে। সমুদ্রপথে আমাদের প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। বিদেশের সাড়ে চার হাজার জাহাজ বাংলাদেশে এই আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন করে।
সাম্প্রতিক সময়ে, চীন চাইছে বঙ্গোপসাগরে তাদের সামরিক আধিপত্য বাড়াতে। এর ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশের বিপদ বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢালাও ভাবে সব চীনা প্রস্তাবে পা দেওয়াটা দেশের অর্থনীতির পক্ষেও বিপজ্জনক। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার(আইএমএফ) থেকে ৪০০-৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। অতিরিক্ত চীন নির্ভরতায় এই ঋণ পেতে অসুবিধা হতে পারে। তাছাড়া চীনা ঋণের ফাঁদে পরে শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো অবস্থা হতে পারে আমাদেরও। প্রতিবেশীদের চটিয়ে চীনকে কৌশলতাদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিলে তা বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হতে পারে।
চীনসমুদ্রে তাদের আধিপত্য বাড়াতে মরিয়া। তাই মিয়ানমারের কিয়াউকপায়ু বন্দর ও পাইপলাইন প্রকল্প, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দরের আধুনিকায়নে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় বিনিয়োগে উৎসাহী তারা। মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের কৌশলগত নির্ভরতা ও ঝুঁকি কমাতে বঙ্গোপসাগর একটি বিকল্প ও সহজ সংযোগপথ তৈরি করতে চায় তারা। এই অঞ্চলে চীনের এই কর্মসূচি বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কৌশলগত উদ্বেগ ও নিরাপত্তা সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।
Comments