সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন পরীক্ষা
পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি রোববার থেকে একক ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত প্রশাসকেরা একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা শরিয়াহ্ভিত্তিক পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব ছেড়েছেন। নিজেদের মূল কর্মস্থল বাংলাদেশ ব্যাংকে ফিরে গেলেন তাঁরা।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা বর্তমান বিএনপি সরকারও অব্যাহত রেখেছে। এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ছিল ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের দখলে। বাকি চারটি ব্যাংকের ছিল আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলমের দখলে। তাঁরা দুজনেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর নতুন ব্যাংকটির নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে আমানতকারীদের। এসব ব্যাংকে আমানতকারীদের জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত মার্চে পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণ করা ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। সারা দেশে এসব ব্যাংকের মোট ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। অর্থাৎ একক ব্যাংক হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী, শাখা ও জনবলের পরিধি বেশ বড়।
প্রশ্ন হলো কেমন করবে এই ব্যাংকটি? সু-প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকের পাশে বাজারে আরও একটি ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দাঁড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক – দু'জনেই অভিজ্ঞ এবং সফল যার যার কর্ম জীবনে। তবে একটা কথা ঠিক – উপরে যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে তাতে কোনোভাবেই কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো করতে পারে না। একদিকে, বাজারে দুর্বল ভাবমূর্তি নিয়ে ব্যবসা করে টিকে থাকা, অন্রদিকে, ব্যাংকের হাজার হাজার কর্মচারী-কর্মকর্তা, তাদের বেতন-ভাতা বোনাসদিয়ে যাওয়া এবং ৭৫ লাখেরও বেশি গ্রাহকের পাওনা টাকা চাবিবা মাত্র পরিশোধ করার মত দূরূহ কাজ করতে হবে ব্যাংকটিকে।
সফল হওয়ার মূল শর্তসমূহ
- সুশাসন ও স্বচ্ছতা: ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি মুক্ত স্বাধীন ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
- খেলাপি ঋণ আদায়: একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর বিশাল অংকের মন্দ ও খেলাপি ঋণ কঠোরহস্তে আদায় বা আলাদা করা।
- প্রযুক্তিগত সমন্বয়: পাঁচটি ব্যাংকের আলাদা আইটি সিস্টেম বা তথ্যপ্রযুক্তি দ্রুত একত্রিত করে গ্রাহক সেবা সহজ করা।
- আস্থা অর্জন: সাধারণ আমানতকারীদের মনে নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং শরিয়া বিধান কঠোরভাবে মেনে চলা।
- কৌশলগত বিনিয়োগ: দেশি-বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগকারী যুক্ত করে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি স্থায়ীভাবে মজবুত করা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল এখনও অস্পষ্ট। প্রায় ২ লাখ হাজার কোটি টাকা আদায়ের নির্দিষ্ট পথরেখা বা রোডম্যাপও জানা নেই। ওইসব ঋণগ্রহীতার সঙ্গে কখন কোন প্রক্রিয়ায় আলোচনা হবে, কতটুকু আদায়যোগ্য সে সম্পর্কে নীতিমালা অনুপস্থিত। আমানতকারীরা তাদের ধৈর্যের চূড়ান্ত সীমায় রয়েছেন। তারা টাকা পাচ্ছেন না।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ঋণদানযোগ্য বিনিয়োগ তহবিল কোথায়? নতুন বিনিয়োগ না হলে এ ব্যাংক কোথা থেকে তহবিলের ব্যবস্থা করবে? প্রচলিত খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এ ব্যাংক লাভের মুখ কীভাবে দেখবে?
Comments