উগ্রবাদের বিস্তারে কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশে কি সশস্ত্র জঙ্গিবাদ পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? সাম্প্রতিক কিছু খবর এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। দুবছর আগে গণঅভ্যুত্থানের সময় জেল থেকে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী পালিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছু জঙ্গির কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরই জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে কি না,সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
তবে পরিস্থিতি যে ঘোলাটে হয়ে উঠতে পারে,এরকম আভাস পাওয়া যাচ্ছিল জুলাই মাসের শুরুর দিকে,যখন দেশের বিভন্ন স্থানে হঠাৎ করেই আরবি হরফে কলেমা লেখা পতাকা উড়তে দেখা যায়। কিছু শহরে কলেমা লেখা পতাকা হাতে নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে ইসলামপন্থিদের মিছিল করতে দেখা যায়।
কিছু ঘটনার দিকে নজর দেওয়া যাক -
সাভারে প্রেশার কুকার বোমা: গত ১২ আগস্ট ঢাকার সাভার উপজেলার বনগাঁও ইউনিয়নের সাধাপুর এলাকার একটি মসজিদের মাঠ থেকে স্কচটেপ মোড়ানো শক্তিশালী একটি প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুপুর ৩টা ২৮ মিনিটে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে বোমাটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে।
মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন এলাকা: এর আগে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে একটি ছাতার ভেতর থেকে লুকানো অবস্থায় একটি শক্তিশালী আইইডি বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস উদ্ধার করা হয়,যা পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ: যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলা এবং সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়ার পর বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বা বোমার ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
কেরানীগঞ্জ ও কুমিল্লা: কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ এবং কুমিল্লার একটি মন্দিরে বিস্ফোরণের মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। এ ছাড়াও বলা হচ্ছে কোন এক ভয়ানক জঙ্গি বোমা মিজহানকে খুঁজছে পুলিশ।
এ দিকে আতংকের খবর দিয়েছে জাতি সংঘ। সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী আল-কায়েদা বাংলাদেশে সক্রিয় সেল গঠনের মাধ্যমে তাদের 'নেটওয়ার্ক' সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এসব ঘটনায় প্রমাণ হয় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ/সহিংস উগ্রবাদের দিকে এগুচ্ছে। তবে এখনই এগুলোকে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজানের মতো বড় ধরনের জঙ্গি-উত্থান বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় সন্ত্রাসী হামলা না হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা-দুর্বলতা জঙ্গি সংগঠনগুলোর পুনরুত্থানের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
১. অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন ও নিয়োগ
জঙ্গি সংগঠনগুলো আগের মতো শুধু গোপন বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতাদর্শ প্রচার,নতুন সদস্য সংগ্রহ ও অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় জঙ্গি মতাদর্শের বক্তা প্রকাশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পাচ্ছে।
২. নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিলীন হয়নি
আনসার আল ইসলাম/আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হরকাতুল জিহাদ হুজি-এর নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সংগঠনের কাঠামো অতীতে নিষ্ক্রিয় বা দুর্বল হলেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি বলে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উল্লেখ আছে।
৩. আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সক্ষমতার দুর্বলতা
রাজনৈতিক পালাবদলের পর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন পুনর্গঠন,বদলি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকে,তখন জঙ্গিবিরোধী নজরদারিতে ফাঁক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা অবকাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিল সংশ্লিষ্ট মহল।
৪. পুলিশ সদর দপ্তরের জঙ্গি হামলার সতর্কতা
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা,জনসমাগমস্থল,ধর্মীয় স্থান,বিনোদনকেন্দ্র,পুলিশ-সেনা স্থাপনা ও অস্ত্রাগারকে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকির তালিকায় রেখে দেশব্যাপী সতর্কতা জারি করেছে। এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
৫. রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে উগ্রবাদের সম্ভাব্য সংযোগ
রাজনৈতিক সংঘাত,মব-সহিংসতা,রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার লড়াই-এসব পরিস্থিতি চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্য নিয়োগ ও প্রচারণার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
৬. ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার সামাজিক বিস্তার
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ঘৃণা,ভিন্নমতকে 'নাস্তিক/কাফের/শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করা,শিল্প-সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সহিংস হুমকি-এসবকে জঙ্গিবাদের প্রাথমিক সামাজিক পরিবেশ হিসেবে দেখা যায়। তবে প্রতিটি ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বা প্রতিবাদকে জঙ্গিবাদ বলা যাবে না।
৭. সীমান্ত ও আঞ্চলিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের ঝুঁকি
বাংলাদেশ একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। ভারতীয় উপমহাদেশ,আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চল এবং মিয়ানমারসহ আশপাশের অঞ্চলের সশস্ত্র নেটওয়ার্ক ও মতাদর্শের প্রভাব নজরে রাখা জরুরি। ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জঙ্গি ইসলামি উপাদানের পুনরায় জায়গা করে নেওয়া এবং সীমান্তের দুর্বলতার কথা বলেছিল।
তবে উগ্রবাদ বাড়ছে-এমন লক্ষণ আর জঙ্গিবাদ সংগঠিতভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে-এ দুটো এক জিনিস নয়।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত হলো 'ইকোসিস্টেম' তৈরি হওয়া। অনলাইন প্রচারণা, মতাদর্শিক উগ্রতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, নিষিদ্ধ সংগঠনের অবশিষ্ট নেটওয়ার্ক - এসব একসঙ্গে শক্তিশালী হলে পরে তা সংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে রূপ নিতে পারে।
Comments