ঋণের পাহাড়, রাজস্বের খরা: বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বড় সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের সরকারি ঋণ শুধু বাড়ছেই না, বাড়ছে সরকারের রাজস্ব আয়ের সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত গতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। কারণ ঋণ নেওয়া নিজে কোনো অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক বিষয় নয়; কিন্তু সেই ঋণের তুলনায় রাষ্ট্রের আয় যদি যথেষ্ট হারে না বাড়ে, তাহলে একসময় ঋণের বোঝা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে।
পরিসংখ্যানটি বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ ছিল বার্ষিক রাজস্বের প্রায় ৩ দশমিক ৩ গুণ। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ গুণে। অর্থাৎ ২০২১-এ সরকার ১০০ টাকা রাজস্ব আয় করলে তার বিপরীতে মোট ঋণ ছিল প্রায় ৩৩০ টাকা। ২০২৬-এ একই ১০০ টাকা রাজস্বের বিপরীতে ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫০ টাকা।
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি ঋণের পরিমাণ নয়, বরং ঋণ ও রাজস্বের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। রাষ্ট্রের আয় যতটা বাড়ছে, দায় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত ২০২১-এর প্রায় ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫-এ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এই বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে খুব নাটকীয় নয়। কিন্তু শুধু ঋণ-জিডিপি অনুপাত দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে সরকার বাস্তবে কত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে তার ওপর।
বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনাই তাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। আইএমএফের সর্বশেষ ঋণ সক্ষমতা বিশ্লেষণেও কম রাজস্ব আহরণ এবং বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ ঋণকে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪-এ জিডিপির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ থাকা কর রাজস্ব ২০২৫-এ নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। সংকীর্ণ করভিত্তি, কর ফাঁকি ও কম অনুগত্য, এবং কর প্রশাসনের নানা অদক্ষতা-সব মিলিয়ে রাজস্ব সংগ্রহের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট।
সমস্যাটি এখানেই যে, উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব খাতে ব্যয় করতে হলে সরকারের সম্পদ দরকার। রাজস্ব সংগ্রহ দুর্বল থাকলে সরকারের সামনে সাধারণত দুটি পথ খোলা থাকে - ব্যয় কমানো অথবা ঋণ বাড়ানো। দীর্ঘদিন দ্বিতীয় পথের ওপর বেশি নির্ভর করলে ঋণের সুদ পরিশোধই একসময় উন্নয়ন ব্যয়ের জায়গা সংকুচিত করতে পারে।
তবে সমাধান হিসেবে হঠাৎ করে করের হার বাড়ানোও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসন আধুনিক করা, কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিন করের বাইরে থাকা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যায় এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব বাড়াতে সাহায্য করে, তাহলে সেই ঋণের অর্থনৈতিক যুক্তি থাকে। কিন্তু ঋণ যদি মূলত চলতি ব্যয় মেটাতেই ব্যবহৃত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দায় বাড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন মূল প্রশ্ন 'কত ঋণ আছে', এটি নয়; বরং ঋণের বিপরীতে কতটা আয় তৈরি হচ্ছে এবং সেই ঋণ কতটা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজস্ব না বাড়িয়ে ঋণ বাড়ানোর পথ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
ঋণ দিয়ে সাময়িকভাবে বাজেটের ঘাটতি সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করা যায় না। সেই ভিত্তি শক্ত করতে হলে রাষ্ট্রকে আয় বাড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় আর্থিক সংস্কারের কাজ সম্ভবত সেখানেই-ঋণের পাহাড় নয়, রাজস্বের ভিত্তি শক্ত করা।
Comments