আজ ২২ শ্রাবণ: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী
বর্ষার মেঘ, বৃষ্টির ছন্দ আর প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্যের সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল এক আত্মিক বন্ধন। যে বর্ষাকে তিনি অসংখ্য গান, কবিতা ও সাহিত্যে অমর রূপ দিয়েছিলেন, সেই বর্ষার ঋতুতেই তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। আজ ২২ শ্রাবণ (৬ আগস্ট)। বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত এই জাদুকরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী।
১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাড়িতে অবসান ঘটে বাংলা সাহিত্যের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের।
মাত্র আট বছর বয়স থেকে সাহিত্যচর্চা শুরু করা রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। সৃজনশীলতার প্রায় প্রতিটি শাখায়—কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, চিঠিপত্র, শিশুসাহিত্য ও চিত্রকলায়—তিনি রেখে গেছেন অসামান্য স্বাক্ষর।
দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা করে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা গানকে। রবীন্দ্রসংগীত আজও বাঙালির আবেগ, আনন্দ-বেদনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের গৌরব অর্জন করেন। এই অর্জন সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক পরিচিতি।
সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি শিক্ষা, সমাজসংস্কার এবং মানবকল্যাণেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পথপ্রদর্শক। মুক্তচিন্তা ও প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষ্যে শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষকের উন্নয়নে তিনি নানা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের প্রদত্ত 'নাইট' উপাধি বর্জন করে তিনি মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর আপসহীন মনোভাবের প্রমাণ রাখেন।
১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্ম নেওয়া রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা সুন্দরী দেবীর চতুর্দশ সন্তান। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা এই কবি বাংলার নদী, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে নিজের সত্তায় ধারণ করেছিলেন।
এক নজরে অনন্য কীর্তি: বাংলাদেশ ও ভারত—দুটি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত তাঁরই অমর রচনা। এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর গানই জুগিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের অন্তহীন অনুপ্রেরণা।
বিশ্বকবির প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে আজ দেশজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের পাশাপাশি রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চস্থ হবে তাঁর জনপ্রিয় গীতিনাট্য 'শ্যামা'।
দেহগতভাবে তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক মূল্যবোধ কোটি মানুষের মননে আজও জ্বেলে চলেছে আলোর দীপশিখা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিরকাল অনুপ্রেরণার এক দীপ্তিময় নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।
Comments