সবজিও যখন বিলাসিতা,তখন স্বস্তি কোথায়?
এক সময় বলা হতো, মাছ-মাংসের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের ভরসা সবজি। কিন্তু সেই বাস্তবতাও এখন অতীত। রাজধানীর কাঁচাবাজারে ঢুকলেই ক্রেতাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া-"সবজির এত দাম!" যে সবজি একসময় স্বল্প আয়ের মানুষের পুষ্টির প্রধান উৎস ছিল, আজ সেটিই অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, কিছু কিছু সবজি আবার ১৫০ থেকে ২২০ টাকাও ছুঁয়েছে। ফলে সবজি আর সাধারণ খাদ্য নয়, ধীরে ধীরে বিলাসিতার পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সংসারের সীমিত আয়ে প্রতিদিনের বাজার করা এখন এক কঠিন সমীকরণ। আগে যেখানে এক কেজি করে কয়েক ধরনের সবজি কেনা হতো, এখন সেখানে অর্ধেক কেজি কিংবা তারও কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। কেউ কেউ আবার দাম শুনেই পছন্দের সবজি রেখে কম দামের বিকল্প খুঁজছেন। অথচ সেই বিকল্পের সংখ্যাও দিন দিন কমে আসছে।
ব্যবসায়ীদের ব্যাখ্যাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাদের দাবি, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিজমিতে ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন কমেছে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, মৌসুমি প্রভাব কৃষিপণ্যের বাজারে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি করেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রভাব কি এতটাই বড় যে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম একযোগে শত টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে?
ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, বাজারে কোনো সবজির সংকট চোখে পড়ছে না। প্রতিটি দোকানেই পর্যাপ্ত সবজি রয়েছে। তাহলে দাম এত বেশি কেন? তাদের অভিযোগ, কার্যকর বাজার তদারকির অভাব এবং সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাই দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। বাস্তবতাও বলছে, যখন বাজারে সরবরাহ দৃশ্যমান থাকে, তখন শুধুমাত্র উৎপাদন কমে যাওয়ার যুক্তি দিয়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ওপর। মাছ, গরু কিংবা খাসির মাংস অনেক আগেই বহু পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অনেকে সাশ্রয়ের জন্য বয়লার মুরগির ওপর নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু সেই বয়লার মুরগির কেজিও এখন ২০০ টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে টমেটো, গাজর, শিমের মতো সাধারণ সবজির দামও আকাশছোঁয়া। ফলে মানুষের পাতে পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে শুধু ভাতের পরিমাণ বাড়ছে, কমছে প্রয়োজনীয় সবজি ও প্রোটিনের অংশ। দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর পড়বে-এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
একটি সুস্থ বাজারব্যবস্থায় মূল্য ওঠানামা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একই সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সামাজিক উদ্বেগের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যদি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে মধ্যবিত্তও ধীরে ধীরে নিম্নবিত্তের কাতারে নেমে আসে। এই বাস্তবতা এখন স্পষ্ট।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার, কৃষি বিপণন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত তদারকি, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি বাজারে পণ্য পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মৌসুমি সংকটের অজুহাতে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়।
সবজি কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক খাদ্যচাহিদার অংশ। তাই এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব, যেখানে সাধারণ মানুষ অন্তত পুষ্টিকর খাবারের জন্য প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হবে না। কারণ মানুষের থালায় সবজি ফিরিয়ে আনা মানে শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং খাদ্যনিরাপত্তা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।
Comments