বেশি সুদের লোভ,নাকি বিপদের সংকেত?
ব্যাংক যখন বাজারের প্রচলিত হারের চেয়ে অনেক বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করতে শুরু করে, তখন সেটিকে অনেকেই সুসংবাদ মনে করেন। একজন সাধারণ আমানতকারীর কাছে এটি বাড়তি আয়ের সুযোগ। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, সব সময় বেশি সুদ মানেই ভালো খবর নয়। অনেক সময় এটি একটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা এবং তারল্য সংকটের ইঙ্গিতও হতে পারে।
বর্তমানে দেশের কয়েকটি ব্যাংক ১১ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। প্রশ্ন হলো, একটি ব্যাংক কেন বাজারের অন্য ব্যাংকগুলোর চেয়ে এত বেশি সুদ দিতে চাইবে? এর সহজ উত্তর হলো-তাদের অর্থের প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রয়োজন স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের জন্য নয়; বরং পুরোনো আমানত ধরে রাখা, নতুন আমানত টেনে আনা এবং দৈনন্দিন নগদ অর্থের সংকট মোকাবিলার জন্য।
সমস্যা হলো, ব্যাংক যদি ১২ শতাংশ সুদে আমানত নেয়, তাহলে লাভ করতে হলে তাকে আরও বেশি সুদে ঋণ দিতে হবে। এতে ভালো মানের উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হন। বরং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ে, যা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করে। অর্থাৎ আজকের উচ্চ সুদ আগামী দিনের আরও বড় আর্থিক সংকটের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ব্যাংক খাতের সংকটের মূল কারণ সুদের হার নয়। বছরের পর বছর অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, বেনামি ঋণ, দুর্বল পরিচালনা এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু বেশি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করা অনেকটা গভীর ক্ষতের ওপর সাময়িক ব্যান্ডেজ লাগানোর মতো।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আমানত নয়, বরং আমানতকারীর বিশ্বাস।
সাধারণ গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে। শুধু কয়েক শতাংশ বেশি সুদের লোভে সঞ্চয় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি, সুশাসন, মূলধন সক্ষমতা এবং খেলাপি ঋণের অবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সুদের হার বেশি হলে লাভ বাড়তে পারে, কিন্তু ঝুঁকিও সমানতালে বাড়ে।
অতএব, উচ্চ সুদের প্রতিযোগিতাকে সুস্থ ব্যাংকিংয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বরং একটি সতর্কবার্তা—যে ব্যাংকিং খাতের ভেতরের সমস্যাগুলো এখনও পুরোপুরি কাটেনি। স্থায়ী সমাধান আসবে তখনই, যখন অনিয়মের অবসান হবে, খেলাপি ঋণ কমবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণ আবার নিশ্চিন্তে ব্যাংকে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ জমা রাখতে পারবেন।
Comments