ক্রিকেটের স্বপ্ন ছেড়ে যেভাবে চট্টগ্রামের আতঙ্ক ‘ডেভিড ইমন’ হলেন মোবারক হোসেন
হাতে একসময় যে হাতে থাকার কথা ছিল ক্রিকেট বল আর স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর, সেই পথ হারিয়ে আজ তিনি চট্টগ্রামের অন্ধকার জগতের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী। বলছি সম্ভাবনাময় বাঁহাতি 'চায়নাম্যান' স্পিনার থেকে অপরাধ জগতের ত্রাস হয়ে ওঠা মোবারক হোসেন ইমনের কথা, যিনি এখন 'ডেভিড ইমন' নামেই বেশি পরিচিত। খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের মহড়ার মাধ্যমে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে অবশেষে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন নজরদারির পর বুধবার ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় একটি যৌথ অভিযান চালানো হয়। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কোতোয়ালি মডেল থানা এবং যশোর জেলা পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানে ডেভিড ইমনকে তার তিন সহযোগীসহ আটক করা হয়।
স্থানীয় ও পরিচিতজনদের ভাষ্যমতে, ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় হন ইমন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তার তীব্র আকর্ষণ ছিল ক্রিকেটের প্রতি। স্থানীয় মাঠ পেরিয়ে একসময় তিনি পা রাখেন চট্টগ্রাম শহরে। ২০১৯ সালের দিকে যোগ দেন ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে। বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি এলাকায় নিয়মিত অনুশীলন করতেন। ভারতীয় বিখ্যাত স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অ্যাকশন অনুসরণ করা এই বাঁহাতি 'চায়নাম্যান' স্পিনারকে নিয়ে অনেকেরই বড় স্বপ্ন ছিল।
ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'ইমন অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল, খুব একটা কথা বলত না এবং নিয়মিত অনুশীলন করত। তবে করোনার পর তাকে আর মাঠে দেখা যায়নি। পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে 'ডেভিড ইমন' নাম আসার পর জানতে পারি, সে আর কেউ নয়, আমাদের সেই ছেলেই।'
ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর অপরাধ জগতে কীভাবে জড়িয়ে পড়েন ইমন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ চক্রে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেন তিনি। ওই সময় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে 'বড় সাজ্জাদ'-এর গ্রুপের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়।
খুব কম সময়ের মধ্যেই নিজের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন ডেভিড ইমন। বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা ও চান্দগাঁওসহ চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা এবং রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে এই চক্রের অপরাধমূলক কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল। পুলিশের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্র চালনায় বেশ পটু ইমন ১৫ থেকে ২০টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহনের ছবিও রয়েছে গোয়েন্দা নথিতে।
বড় সাজ্জাদের আরেক সহযোগী 'ছোট সাজ্জাদ' কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম সরাসরি মাঠপর্যায়ে বড় সাজ্জাদের অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
পুলিশের রেকর্ডপত্র বলছে, অপরাধ জগতে পা রাখার পর অল্প সময়েই একাধিক গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়েন ডেভিড ইমন।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় তার নাম আসে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় 'ঢাকাইয়া আকবর' হত্যা মামলাতেও তার নাম যুক্ত রয়েছে।
সর্বশেষ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসেন এই সন্ত্রাসী।
অবশেষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের মুখে যশোর থেকে সহযোগীদেরসহ জালে বন্দি হলেন এই একসময়ের উদীয়মান ক্রিকেটার, যিনি আজ চট্টগ্রামবাসীর কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
Comments