জুলাইয়ে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার আশঙ্কা, জুনের দ্বিগুণ হতে পারে
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশে টানা থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যার ফলে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজননের বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগের মাসের তুলনায় বিদায়ী জুন মাসে ডেঙ্গু শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ব্যর্থ হলে জুলাই মাসে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা জুনের তুলনায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরম কিংবা মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত এডিস মশার প্রজননের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে। চলতি মাস থেকে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ সময়ে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা জন্মাবে। এ উপদ্রব থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সাধারণ মানুষকে নিজ উদ্যোগে নিজেদের বাড়ির আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে রাজধানীসহ সারা দেশে মশক নিধনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা জরুরি।
এর পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা প্রস্তুতিও যথাযথভাবে নেওয়ার জন্য জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল ১০ জুলাই পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৭ হাজার ৮২৫ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৭ হাজার ১৪১ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে গেছেন। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী এরই মধ্যে মারা গেছেন ২৪ জন, যার মধ্যে অর্ধেক নারী এবং বাকি অর্ধেক পুরুষ। বর্তমানে এখনো ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬৫০ রোগী। এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া ৭ হাজার ৮২৫ জনের মধ্যে ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী।
চলতি বছরের মাসের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ৮১ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান দুজন। ফেব্রুয়ারিতে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৪০৯ জন এবং এ মাসেও ডেঙ্গুতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবে মার্চে ৩৫৩ জন এবং এপ্রিলে ৬৪০ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মে মাসে ৭১৪ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি মারা যান এক রোগী। এরপর জুনে এসে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বিদায়ী জুন মাসে ২ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১০ জন। এদিকে জুলাইয়ের শুরুটাও বেশ আশঙ্কাজনক, কারণ চলতি মাসের গত ১০ দিনেই দেশে ১ হাজার ৭১১ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং সরকারি হিসাবে মৃত্যু ঘটেছে ছয়জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগ ও এলাকাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে বরিশাল বিভাগে, সেখানে ২ হাজার ৫৭ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন দুজন। চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৪১৩ জন এবং মারা গেছেন তিনজন। ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৯১৭ রোগী হাসপাতালে এসেছেন এবং মারা গেছেন একজন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭০০ রোগী ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন পাঁচজন। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৩৪ জন এবং ওই এলাকায় মারা গেছেন চারজন। খুলনায় ৯৭৭ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। ময়মনসিংহে ২৩৬ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং সেখানে মারা গেছেন পাঁচজন। রাজশাহীতে ২৭৭ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে মারা গেছেন একজন। তবে সিলেট বিভাগে ৭২ জন এবং রংপুর বিভাগে ৩২ রোগী শনাক্ত হলেও সেখানে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। গত কয়েক বছরে উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার বাইরের ডেঙ্গুর নতুন হটস্পটগুলো। বিশেষ করে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ এখন বাড়ছে। সম্ভাব্য এ ভয়াবহ সংক্রমণ ঠেকাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দেশের সব জেলা শহরে অবিলম্বে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সামনের দিনে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে পরিত্রাণের জন্য এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি, কারণ মশক নিধনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে সচেতন হয়ে নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং টবে কিংবা বাসাবাড়িতে তিন দিনের জমে থাকা পানি ফেলে দিতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু তার চূড়ায় পৌঁছাবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
Comments