এবারের বাজেটকে 'জীবনবান্ধব বাজেট' নামকরণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
এবারের বাজেটকে 'জীবনবান্ধব বাজেট' হিসেবে নামকরণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এবারের বাজেটে অনেক পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার করার ফলে বাজেট-পরবর্তী সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি। সরকার কোনো সংকটকে অজুহাত বানাতে চায় না, বরং তা সফলভাবে মোকাবিলা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আজ সোমবার (২৯ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সংসদের সময় অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা এখানে দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন আমাদের অবশ্যই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের প্রতিটি মানুষ চায়, আমরা সংসদে ভবিষ্যৎমুখী আলোচনা করি।"
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি যে চাপে পড়েছে, তা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই এবারের বাজেটের আকার বড় করতে হয়েছে। তবে সরকার অর্থনীতিকে গুটিকয়েক সুবিধাভোগী মানুষের কবল থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চায়।
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, "স্বৈরাচারের সময় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির স্বার্থে দেশের অর্থনীতিকে কুচি কুচি করা হয়েছে। সেখান থেকে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রকল্পে কত টাকা বিনিয়োগ হলো তা মুখ্য নয়, বরং তা মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সরকার সেটাই বিবেচনা করবে।"
বাজেটের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সর্বোচ্চ স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার উৎপাদনমুখী বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ জন্য নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
কৃষক ও প্রবাসীদের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন: যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ আছে, তা সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। আলাদা কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের প্রাত্যহিক বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ও ক্রীড়া খাতে বেশ কিছু বড় পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরেন:
'এডুকেশন ফার্স্ট' নীতি বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আগামী ৫ বছরে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা কাঠামো পরিবর্তন করে কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিক্ষাক্রমে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন (চীনা), জাপানিজ, ফ্রেঞ্চসহ বিভিন্ন আধুনিক ভাষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবে পিছিয়ে না থাকে, সে লক্ষ্যে কাজ চলছে।
শিক্ষাক্রমে স্পোর্টস বা খেলাধুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। 'নতুন কুঁড়ি' কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কৃতি ক্রীড়াবিদদের খুঁজে বের করে নতুন ভাতার আওতায় আনা হবে।
জ্বালানি খাতের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বিগত সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন দুর্নীতি হয়েছে, যা শুনলে গা শিউরে ওঠে। কতিপয় বিদেশি কোম্পানি ও ব্যক্তির স্বার্থে এই খাত চালানো হয়েছে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের চেষ্টাই করা হয়নি।" তিনি জানান, ভোলায় নতুন গ্যাস পাওয়ায় সেখানে একটি আধুনিক শিল্প পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন তিনি।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকার জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে ১৩টি দেশে ২৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে 'নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট' সই হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট (রিং), ক্যান্সারের ওষুধসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রীর দাম কমাতে ভ্যাট ও ট্যাক্স সর্বোচ্চ কমানো হবে। কর প্রত্যাহার করা হলে হার্টের রিং বসানোর খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে দুটি বিশেষ সুপারিশ করেন, ১. আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা বা কর অব্যাহতির সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা। ২. সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে 'টিন সার্টিফিকেট' বাধ্যতামূলক করার যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা।
Comments