অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নাগরিক সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের হার বেড়েছে: টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২৩ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চেয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে বেশি সংখ্যক পরিবার দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হয়েছে। গতকাল ধানমন্ডি কার্যালয়ে 'সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫' শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনের মূল তথ্যগুলো তুলে ধরা হলো:২০২৫ সালে সেবা নিতে গিয়ে ৮১.৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭০.৯ শতাংশ। ঘুষ দেওয়ার হার ৫০.৮ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩.৬ শতাংশে। বিগত বছরের মতোই ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট এবং বিআরটিএ সংক্রান্ত সেবাগুলো সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ইতিবাচক দিক হলো, পরিবারপ্রতি পরিশোধিত গড় ঘুষের পরিমাণ ৯.৮ শতাংশ কমেছে। ২০২৩ সালে গড় ঘুষ যেখানে ছিল ৫,৬৮০ টাকা, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫,১২৪ টাকায়। বিচারিক সেবা, ব্যাংকিং এবং ভূমি-সংক্রান্ত সেবার ক্ষেত্রে নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি অঙ্কের গড় ঘুষ দিয়েছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২,৬৩৩ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশের সমান।
টিআইবি'র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জানান, "ঘুষ দেওয়াকে বর্তমানে একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করা হয়েছে।" জরিপে দুর্নীতির ক্ষেত্রে তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ফুটে উঠেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারগুলো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সেবা পেতে তাদের মাসিক আয়ের গড়ে ৩৪ শতাংশ ঘুষ হিসেবে দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি মাসিক আয়ের সাড়ে চার গুণ পর্যন্ত ঠেকেছে। সাধারণ পরিবারগুলো তাদের বার্ষিক আয়ের গড়ে ১.৭ শতাংশ ঘুষে ব্যয় করলেও, শীর্ষ ৫টি দুর্নীতিপ্রবণ খাতের কারণে দরিদ্র পরিবারগুলোকে বার্ষিক আয়ের ৫.১ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়েছে (যেখানে উচ্চ আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৩.২ শতাংশ)।
জরিপে অংশ নেওয়া ১৩টি পরিবার জানিয়েছে, তাদের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি অর্থ (কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৬ গুণ) ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছে। শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে দুর্নীতির বোঝা অনেক বেশি। এছাড়া নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়গুলো এই দুর্নীতির কারণে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর জনগণের আস্থার চরম ঘাটতি এই জরিপে স্পষ্ট হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা দুদক সম্পর্কে জানলেও, তাদের মধ্যে মাত্র ০.৯ শতাংশ কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে মানুষ এখনও দুদককে বিশ্বাস করে না। তিনি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনগণের আস্থা অর্জন এবং সততা ও যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দুদকে নিয়োগের মাধ্যমে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত 'নতুন বাংলাদেশ' নিয়ে মানুষের যে বিপুল আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
Comments