প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরকে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর (দ্বিতীয় গন্তব্য)। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, শিল্প ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ১৫টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ব সংবাদমাধ্যম 'গ্লোবাল টাইমস'-এ প্রকাশিত সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের দক্ষিণ এশিয়া সেন্টারের পরিচালক লিউ জোংই-এর এক মতামত নিবন্ধে এই সফরের বহুমাত্রিক দিক ও কৌশলগত সমীকরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও চীন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে সমতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অনন্য উদাহরণ।
টানা ১৫ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি হওয়া শতভাগ শুল্কযোগ্য পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে বেইজিং। পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাংলাদেশের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, তার পেছনে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার বড় ভূমিকা রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর আওতায় আঞ্চলিক যোগাযোগ রক্ষা এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা ও সুশাসনে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
এই দ্বিপাক্ষিক অগ্রযাত্রার মধ্যেও কিছু কাঠামোগত ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, কিছু পরাশক্তি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে টানার চেষ্টা করছে। এমনকি 'ঋণের ফাঁদ' তত্ত্বের মতো কাল্পনিক প্রচারণা ব্যবহার করে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের কিছু অভিজাত বা প্রভাবশালী মহল পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতি বেশি আস্থাশীল এবং চীনের সহযোগিতার সুবিধা স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির জন্য শুধু চীনা পণ্যকে দায়ী করা হলেও, বাংলাদেশের নিজস্ব রপ্তানি পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য ও সক্ষমতার মতো কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে উভয় পক্ষের আরও দূরদর্শিতা ও খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের প্রকৃত অর্থে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' (বাংলাদেশ প্রথম) নীতি অনুসরণের রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে। বাংলাদেশি গণমাধ্যমের প্রত্যাশা অনুযায়ী, এই সফরের মাধ্যমে ৩টি প্রধান দিকে অগ্রগতি হবে।
- শিল্প খাতে স্থানান্তর: চীন তাদের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে শিল্প কেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করছে। তুলনামূলক কম শ্রমব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হবে।
- গ্লোবাল সাউথ ও বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম: 'চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো' এবং 'চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ' ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ার মূল শিল্প ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারবে।
- সুশাসনের অভিজ্ঞতা বিনিময়: রাজনৈতিক দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দুই দেশের সুশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় জোরদার করা।
উন্নয়নের কোনো একক বা নির্দিষ্ট বৈশ্বিক মডেল নেই। পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় জগতের সফল অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটিয়ে নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে আধুনিকায়নের পথ অনুসরণ করার মতো সক্ষমতা ও ঐতিহাসিক সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে তৈরি হয়েছে।
Comments