কেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ব্যর্থ হলো
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালনা করেছে, তা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাঠ্যপুস্তকে একটি বিশেষ স্থান পাওয়ার যোগ্য। কারণ এটি ক্ষমতার ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়নি, বরং দেখিয়েছে যে ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণাগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ,এবং শক্তির ভারসাম্যও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শক্তি প্রয়োগের ফলাফল আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, কারণ জবরদস্তিমূলক কৌশল আর সরলরৈখিক ফলাফল সৃষ্টি করে না। এটি শুধু সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেই নয়, যেমন ইরানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বরং নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সব পক্ষের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত বক্তব্য ও প্রচারণা বাদ দিলে চিত্রটি খুবই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি স্পষ্টত শক্তিশালী জোট তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও তাদের প্রতিপক্ষ ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল-ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলো, যারা সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের সীমিত সমর্থন পেয়েছিল।
লক্ষ্য ছিল এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে দ্রুত ও বিধ্বংসী আঘাত হানা, যাকে বহিরাগত চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে দুর্বল বলে মনে করা হচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের "নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ" দাবি সেই মানসিকতারই প্রতিফলন ছিল, কারণ ধারণা করা হয়েছিল যে তেহরান চাপের মুখে ভেঙে পড়বে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। প্রাথমিক নেতৃত্ব-নিধনমূলক হামলার পরও ইরান ভেঙে পড়েনি; বরং তারা পুনর্গঠিত হয়েছে, জনগণকে সংগঠিত করেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, নিজেদের প্রতিক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ করে রাখা বহু বাধা দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
এখানেই নতুন যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে- প্রতিরোধ। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি, কিন্তু তার প্রয়োজনও পড়েনি। কারণ তারা নিজেদের হাতে থাকা উপায়গুলো এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা প্রতিপক্ষের অনেক সুবিধাকেই নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
প্রথমত, তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছিল, যদিও আগে বহুবার হুমকি দিলেও কখনো তা বাস্তবে করেনি। দ্বিতীয়ত, তারা শুধু অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অংশীদারদের সম্পদেও আঘাত হানে। তৃতীয়ত, তারা বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় দুর্বল হলেও এমন দেশগুলোর জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর ছিল যারা এ ধরনের আঘাত সহ্য করতে অভ্যস্ত নয়। চতুর্থত, ইরান এমন মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা তাদের প্রতিপক্ষদের তুলনায় অনেক বেশি।
বর্তমান পরিস্থিতিই অনেক কিছু বলে দেয়। যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধে নেমেছিল, তার কোনো সমাধানই হয়নি। সবকিছু আবার ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। আর সবাই জানে,পারস্য কূটনীতির ঐতিহ্যে আলোচনা মানেই ধৈর্য,অধ্যবসায় এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
মূলত,একটি তীব্র সশস্ত্র সংঘাতের পর, যা পুরো বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছিল, যুদ্ধের শুরুতে যে স্থিতাবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল সেটিই আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী আবার নৌচলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যদিও এর শর্তাবলি এখনো স্পষ্ট নয় এবং উভয় পক্ষই সেগুলো ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে সামরিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ছে,আর শক্তিশালী পক্ষের ঝুঁকি গ্রহণের ইচ্ছা,বিশেষত নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা,কমছে। এটি অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই সত্য, তবে মধ্যপ্রাচ্যে তা বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
এর বৃহত্তর রাজনৈতিক ফলাফল হলো বিশ্বের প্রধান শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আপেক্ষিক দুর্বলতা। ট্রাম্প দেখিয়েছেন যে তিনি আরেকটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে জড়াতে অত্যন্ত অনিচ্ছুক, বিশেষত এমন এক যুদ্ধে নিজের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর, যার সূচনা তিনিই করেছিলেন।
একদিকে এটি বাস্তববাদী চিন্তার পরিচয়, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন যে আরেক দফা সংঘর্ষ সম্ভবত আগের মতোই অচলাবস্থায় গিয়ে শেষ হবে। কিন্তু অন্যদিকে এটি বিশ্বকে একটি বার্তাও দেয়-যুক্তরাষ্ট্র আর শুধুমাত্র মর্যাদা ও আধিপত্য বজায় রাখার জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। তাদের মিত্রদের এখনও মার্কিন শক্তিকে বিবেচনায় রাখতে হবে, কিন্তু তারা আর ধরে নিতে পারবে না যে ওয়াশিংটন সবসময় তাদের হয়ে চূড়ান্ত দায়িত্ব বহন করবে।
এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে এটি বিশেষভাবে দৃশ্যমান, একই যুক্তি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রযোজ্য।
মধ্যমেয়াদে এর প্রভাব কী হবে তা বলা এখনও খুব তাড়াতাড়ি। তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা শুরু হয়েছিল,তা স্পষ্টতই নড়বড়ে হয়ে গেছে। এই কাঠামোটি ইসরায়েল ও তার আরব প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে ধনী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর, ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এর ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ইরান ও তার মিত্রদের প্রান্তিক করে দেওয়া।
২০২৩ সালে হামাসের ইসরায়েলের ওপর হামলা এবং তার জবাবে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান এই কৌশলকে বড় ধাক্কা দেয়। তবে গাজা সংকটও পুরো প্রকল্পটিকে থামিয়ে দিতে পারেনি; বরং তা কেবল বিলম্বিত করেছিল।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টির আরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা। লক্ষ্য ছিল মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্যের ভিত্তিতে পুরো অঞ্চলকে পুনর্গঠন করা এবং একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইরানকে আঞ্চলিক সমীকরণ থেকে সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
বর্তমান সংঘাতের এই পর্যায় কোনো সমস্যার সমাধান করেনি। ফলে ভবিষ্যতে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এসব প্রশ্ন মীমাংসার আরও চেষ্টা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেগুলো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আগের তুলনায় কম অনুকূল পরিস্থিতিতে ঘটবে। ওয়াশিংটনের আপেক্ষিক ব্যর্থতা এবং তেহরানের আপেক্ষিক সাফল্য,যদিও ইরানের ক্ষয়ক্ষতিকে খাটো করে দেখা উচিত নয়,শক্তির ভারসাম্যকে ইরানের দিকে কিছুটা ঝুঁকিয়ে দিয়েছে।
এখন অনেক কিছু নির্ভর করবে ইরানের নবায়িত ও তুলনামূলকভাবে তরুণ নেতৃত্ব কীভাবে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগায় তার ওপর। অস্থিরতার ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে,কারণ কোনো স্থায়ী সমঝোতা বা স্থিতিশীল আঞ্চলিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। সেই যুগ শেষের পথে, যখন কেবলমাত্র সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করতে পারত। যুদ্ধ এখন আরও জটিল হয়ে উঠছে,এর পরিণতি কম নিয়ন্ত্রণযোগ্য হচ্ছে এবং ফলাফলও আর সরলরৈখিক থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে এখনও বিপুল সামরিক শক্তি রয়েছে,কিন্তু ইরান দেখিয়েছে যে শুধু সামরিক শক্তির আধিক্যই আর বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না।
Comments