ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি সই: শিগগিরই বিস্তারিত প্রকাশের ঘোষণা ট্রাম্পের
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ফ্রান্সে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, চুক্তির সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে এবং খুব শিগগিরই এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই চুক্তিকে 'লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে স্থায়ী সামরিক অভিযান বন্ধের' একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তেহরানে কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে টানা ১৪-১৫ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর এই ঐতিহাসিক সমঝোতা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সই হওয়া সমঝোতা স্মারকটি মূলত মাত্র দেড় পৃষ্ঠার একটি সাধারণ রূপরেখা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লমেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই চুক্তিতে সই করেছেন। এই চুক্তির মাধ্যমে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য উভয় পক্ষ কারিগরি ও রাজনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাবে।
ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এবং ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, সেখান দিয়ে ইতিমধ্যে তেলের জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে।
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা এবং সন্ত্রাসী সংস্থাকে অর্থায়ন বন্ধের অঙ্গীকার রয়েছে। এছাড়া ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপের ওপর ভিত্তি করেই কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা আটকে থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালির নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরান যদি আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তবেই তারা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে প্রস্তুত।
চুক্তির কাঠামোতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সেখান থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত নেই। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার বহাল থাকবে। এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়েছেন, সিরিয়া, লেবানন ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী 'যতদিন প্রয়োজন' অবস্থান করবে এবং চুক্তি যাই হোক না কেন—ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই চুক্তিকে তেহরানের বড় 'বিজয়' হিসেবে প্রচার করছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য করেছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের ওপর তাদের 'গভীর অবিশ্বাস' এখনো কাটেনি এবং এটি কেবল উত্তেজনা হ্রাসের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র।
অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই সমঝোতা দীর্ঘদিনের সহিংসতার চক্র বন্ধে বাস্তবসম্মত ভূমিকা রাখবে। আগামী শুক্রবার জেনেভায় এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত রূপ পেতে যাচ্ছে।
Comments