ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা, এখন কী ঘটবে?
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রাথমিক এক চুক্তিতে পৌঁছেছে উভয়পক্ষ। এই চুক্তির খবরে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নেমে এসেছে স্বস্তির ছায়া, স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও।
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ঘোষিত এই প্রাথমিক চুক্তিতে কী কী থাকছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান যা জানিয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো :
• চুক্তির বাস্তবায়ন এবং কখন কী ঘটবে?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, উভয় পক্ষই অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
সব পক্ষই বলেছে, যুদ্ধ অবসানের এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে সই হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী বলেছেন, সই হওয়ার পরই সমঝোতা স্মারকটি প্রকাশ করা হবে।
উভয় পক্ষ বলেছে, বিরোধের আরও জটিল বিষয়গুলো—বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পরবর্তী ৬০ দিন ধরে আলোচনা চালানো হবে।
• হরমুজ প্রণালি এবং ইরানি বন্দরের ওপর অবরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ইরানের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেছেন, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর প্রণালিটি ''সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য'' উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের মাধ্যমে প্রণালির সামুদ্রিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
• ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
উভয় পক্ষই বলেছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার বিষয়ে রাজি হয়েছে; যা তেহরান গত কয়েক দশক ধরেই বারবার বলে আসছে। ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান নিজের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখবে; যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা পারমাণবিক স্থাপনার সম্প্রসারণ না করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় ইরান দেশের ভেতরে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তরলীকৃত করতে পারবে বলে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে।
এর আগে, গত শনিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উপকরণের মজুত সরিয়ে নেওয়ার কোনও তাড়াহুড়ো নেই এবং পরিস্থিতি ''সব শান্ত হলে'' যুক্তরাষ্ট্র তা উদ্ধার করবে।
ট্রাম্প বলেছেন, যেকোনও চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর একটি শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হবে। তবে এই ব্যবস্থা কী ধরনের হবে, সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য জানাননি তিনি।
মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে যেকোনও চূড়ান্ত চুক্তি কংগ্রেসের পর্যালোচনা এবং অনুমোদন পেতে হবে।
• নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক প্রভাব
ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেছেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের ওপর নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার বিষয়ে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট এক মেয়াদের জন্য ইরানের ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পর সম্মত সময়সূচী অনুযায়ী মার্কিন ও জাতিসংঘের সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর মাঝে সহযোগিতা এবং আর্থিক ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমসহ ইরানের জব্দ করা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে; যা ৬০ দিনের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
যদিও ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে কোনও নগদ অর্থ দেওয়া হবে না। তবে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হতে পারে।
• লেবানন
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের এই সিদ্ধান্তের মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবালয় বলেছে, লেবাননসহ সব জায়গায় সোমবার রাত থেকে স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং এই রূপরেখা চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় তাদের দখল করা নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান করবে এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
সমঝোতা স্মারক ঘোষণার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি লেবাননসহ ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, লেবাননে আর কোনও ইসরায়েলি হামলা হওয়া উচিত নয় এবং ইসরায়েলের ওপর ইরান-সমর্থিত লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও আর কোনও হামলা চালানো যাবে না।
Comments