ভারত সফরে মিয়ানমারের জান্তা সমর্থিত প্রেসিডেন্ট
ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে পৌঁছেছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। পাঁচ দিনের এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবার (৩০ মে) সকালে ভারতের বিহার রাজ্যে পৌঁছান মিন অং হ্লাইং। সেখান থেকে তিনি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান বোধগয়ায় যান এবং মহাবোধি মন্দিরে প্রার্থনা করেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট। এছাড়া ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গেও তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এ সফর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান 'আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের' প্রতিফলন। ২০১৯ সালের পর এটিই মিন অং হ্লাইংয়ের প্রথম ভারত সফর। সে সময় তিনি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান হিসেবে ভারত সফর করেছিলেন।
২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর থেকে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মিন অং হ্লাইং। চলতি বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনের পর তিনি সামরিক পোশাক ত্যাগ করে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সমালোচকদের অভিযোগ, ওই নির্বাচন মূলত সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই আয়োজন করা হয়েছিল।
সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হলে তা ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
নির্বাচনে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সংঘাতপ্রবণ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভোটগ্রহণও বাতিল করা হয়।
৮০ বছর বয়সী সু চি এখনও আটক রয়েছেন। গত এপ্রিলে সাধারণ ক্ষমার অংশ হিসেবে তার সাজা কমানো হয়েছে এবং তাকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি অবস্থায় নেওয়া হয়েছে বলে জানায় মিয়ানমার সরকার। তবে তার অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। এ মাসে সু চির ছেলে কিম অ্যারিস দাবি করেন, তার মা জীবিত আছেন—এমন কোনো স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মিয়ানমারের বর্তমান নেতৃত্ব আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনগুলো থেকে দেশটির সামরিক নেতাদের কার্যত দূরে রাখা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর মিন অং হ্লাইং এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। এর অংশ হিসেবে ভারত সফরের পর শিগগিরই তার চীন সফর এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও সমালোচনা সত্ত্বেও দিল্লি নেপিদোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই সফর নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। 'জাস্টিস ফর মিয়ানমার' নামের একটি অধিকারভিত্তিক সংগঠন ভারতের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানানো সামরিক সরকারের প্রতি বৈধতার বার্তা দেয়। সংগঠনটির দাবি, মিয়ানমারের জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানোই ভারতের উচিত।
Comments