বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট:কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরীক্ষা
ঈদের পর পরই সরকার জাতির সামনে হাজির করবে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট। সংসদে ১৯ বছর পর এটি হতে যাচ্ছে বিএনপির বাজেট। কেমন হবে এবারের বাজেট? সরকার কতটা জনগণকে স্বস্তি দিতে পারবে তার আর্থিক প্রস্তাবনায়?
উচ্চ মুল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ ১১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, আর বেসরকারি বিনিয়োগ নেমেছে বহু বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে। এমন বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট আসলে বলে দেবে-সরকার কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক সাহস রাখে কি না, নাকি আগের সরকারগুলোর মতো গতানুগতিক বাজেটই দেবে।
ক্ষমতায় আসার পর বলতে গেলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে-আগামী মাসে জাতীয় সংসদে প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরপরই নতুন সরকার অপ্রত্যাশিত বৈশ্বিক সংকটে পড়ে। মাত্র ১১ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক আশাবাদের পরিবেশ দ্রুতই অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় রূপ নেয়।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশই তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়ে। সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে তেল ও এলএনজি সংগ্রহ করতে বিপুল অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়েছে, শুধু অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য। এর ফলে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ এত বেড়ে যায় যে সরকারকে অন্তত ২.৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ নিতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দুর্বল হয়ে পড়া আর্থিক খাত। এমন অবস্থায় নতুন অর্থবছরের জন্য সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজেট প্রস্তুত করতে হচ্ছে। একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে নাজুক অর্থনৈতিক বাস্তবতা-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
করের আওতা বৃদ্ধি ও বৈষম্য কমানোর প্রয়োজন
সরকার পরিচালনা, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে রাজস্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু প্রধান সমস্যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), যা নিয়মিতভাবেই নিজেদের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়।
ফলে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন। অথচ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এটি ১৫ শতাংশে উন্নীত করা।
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও কর ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর ফাঁকি দাতাদের করের আওতায় আনা। বর্তমানে এনবিআর নতুন করদাতা যুক্ত করার বদলে বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকেই বেশি আদায়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
এছাড়া কর অব্যাহতি, ছাড় ও বিশেষ সুবিধাগুলো পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১.৭ লাখ কোটি টাকা, যা আয়কর আদায়ের প্রায় সমান।
এই ধরনের কর সুবিধা মূলত শিল্প ও ব্যবসা খাতকে উৎসাহ দিতে দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এর অপব্যবহার হয়। যেমন-পোলট্রি ও মৎস্য খাতে কম করের সুবিধা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিপুল আয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব কর সুবিধার কার্যকারিতা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমাতে সরকারকে পুনর্বণ্টনভিত্তিক রাজস্ব নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে ধনীদের ন্যায্য হারে কর আদায় করে দরিদ্রদের জন্য শুধু সহায়তা নয়, উন্নয়নের সুযোগও সৃষ্টি করা যায়।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও স্বীকার করেছে যে, কম রাজস্ব আদায়ের সমস্যা কেবল 'প্রযুক্তিগত' নয়; বরং এটি একটি বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতির ফল, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আয়ের মানুষ করের বাইরে থেকেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবন
বর্তমানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
শুধু উচ্চ সুদের হার ধরে রাখলে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়-সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেটিই দেখিয়েছে। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, বন্দর ও কাস্টমস জটিলতা ইত্যাদি কাঠামোগত সমস্যার কারণে তৈরি হয়েছে।
একইসঙ্গে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে, যা বর্তমানে জিডিপির মাত্র ২২.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে-বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে গেছে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, খেলাপি ঋণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন "অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ" নীতি অনুসরণ করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে সরকারকে দ্রুত নীতিগত সংস্কার আনতে হবে-বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ঋণনির্ভরতা থেকে বের হওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সরকারের মোট ঋণ প্রায় ২৪ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। বৈদেশিক ঋণ ১১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানো এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় সরকারকে এখন একসঙ্গে বিপুল কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪.১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে ঋণ পরিশোধ ব্যয়-রাজস্ব অনুপাত ১৬.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ সীমার কাছাকাছি।
এই চাপ কমাতে সরকারকে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং কর ফাঁকি বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় পুনর্বিন্যাস করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খতিয়ে দেখে অপচয়, দুর্নীতি ও প্রকল্প বিলম্ব কমাতে হবে।
বিএনপি সরকার একদিকে 'ফ্যামিলি কার্ড', কৃষিঋণ মওকুফ ও নতুন বেতন কাঠামোর মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, অন্যদিকে ঋণনির্ভরতা কমানোর কথাও বলছে। তাই অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প স্থগিত রেখে দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল দেবে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার চূড়ান্ত পরীক্ষা
আসন্ন বাজেট কেবল বড় অঙ্কের হিসাব আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতির দলিল হলে চলবে না। বাস্তব অর্থনৈতিক তথ্যের ভিত্তিতে এটি হতে হবে এমন একটি কার্যকর পরিকল্পনা, যা সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিশ্চিত করবে এবং অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনবে।
সবশেষে, এই বাজেটই প্রমাণ করবে-নতুন সরকার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় কঠিন সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রাখে কি না, নাকি অতীতের মতোই আত্মতুষ্টির পথে হাঁটবে।
Comments