মূল্যস্ফীতির চাপ : মানুষের টিকে থাকার লড়াই
মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেল। সর্বশেষ এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে। এর আগে মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরেক দফা বাড়ল।
বাজারে আগুন লেগেই ছিল। এখন আরও বড়োভাবে লাগবে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের স্বস্তির কোনো সামান্য জায়গাও আর থাকছে না। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। তার উপর, অকাল বন্যায় ফসল নষ্ট হয়েছে হাওর অঞ্চলে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের,বিশেষ করে স্বল্প বেতনের বা আয়ের মানুষের জীবনের মান দ্রুত পড়ে যাচ্ছে গহ্বরে।
অর্থনীতিবিদরা এটা ভালো জানেন যে, মূল্যস্ফীতির চাকা একবার গড়াতে শুরু করলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা অতি কঠিন। ২০২৩ সাল থেকেই বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। গত আমলে যে বিএনপি নেতারা পথঘাট কাঁপিয়ে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতেন, ক্ষমতায় আসীন হয়ে এখন তারা সত্যটি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন।
আর্থিক বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক দফা সুদের হার বাড়িয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক যুক্তি বিলক্ষণ আছে, কিন্তু তাতে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো না গেলেও কমেছে ব্যাবসা বাণিজ্যের গতি। তাতে কমেছে কর্মসংস্থান, কমেছে মানুষের আয়।
এবারের চিত্রটা খুবই উদ্বেগজনক। টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পর মার্চে মূল্যস্ফীতি কমেছিল, এখন এপ্রিলে আবার বাড়ল। এর মানে হলো, গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিও মার্চের ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে এপ্রিলে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।
গত ১৯ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে।
দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছাড়িয়ে গেছে মানুষের আয় বৃদ্ধির হারকে। ফলে বড়ো বিপদে আছে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট কেবল বাড়ছেই। আয় না বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিবারের চিকিৎসা, খাদ্য, সন্তানের লেখাপড়া–সবকিছুতে খবরচ কমাতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান চিত্র আসলে শুধু অর্থনীতির একটি সংখ্যাগত সংকেত নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর-উভয় সমাজের ভেতরে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের প্রতিফলন। গ্রামে মানুষ খাদ্য ও কৃষি ব্যয়ের চাপে বিপর্যস্ত; শহরে মানুষ টিকে থাকার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে সমস্যাটিকে কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানো বা মুদ্রা সংকোচনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, সমন্বিত এবং মানবকেন্দ্রিক নীতি।
বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা কমাতে না পারলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে না। মজুতদারি, কারসাজি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক তদারকি জরুরি। একই সঙ্গে কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তা যেন সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারেন-এই ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।
নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাস্তব অর্থে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। শুধু সহায়তা কর্মসূচির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; তা যেন প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামে কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা, শহরে স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ ও নগর দরিদ্রদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যকরভাবে চালু করতে হবে।
মজুরি ও আয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি যদি নিয়মিতভাবে মানুষের আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তবে মধ্যবিত্তও ধীরে ধীরে অনিরাপদ শ্রেণিতে পরিণত হবে। তাই শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় সমন্বয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
মূল্যস্ফীতিকে শুধু অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার মান কমায়, হতাশা বাড়ায় এবং সমাজে বৈষম্য গভীর করে। তাই এখন প্রয়োজন এমন নীতি, যা শুধু বাজারকে নয়, মানুষের জীবনকেও স্থিতিশীল করবে।
Comments