অডিটে বারাকা-কর্ণফুলী গ্রুপে গরমিলের বিস্তৃত চিত্র
বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বারাকা-কর্ণফুলী গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে আর্থিক গরমিল, হিসাব কৌশলে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো, কর সংরক্ষণে অনিয়ম এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে।
৩০ জুন ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা অনুযায়ী, অবচয় হিসাব, গ্র্যাচুইটি দায়, লিজ দায় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একাধিক বিচ্যুতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তুলনায় ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।
নিরীক্ষা তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর সঙ্গে ১৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে অবচয় ১৫ বছর ধরে হিসাব করার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ৩০ বছর ধরে অবচয় হিসাব করছে। এর ফলে অবচয় কম দেখিয়ে কাগজে-কলমে মুনাফা বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করছেন অডিট সংশ্লিষ্টরা। এই পদ্ধতির কারণে চুক্তির মেয়াদ শেষে কর্ণফুলী পাওয়ার লিমিটেডে প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা এবং বারাকা শিকলবাহা পাওয়ার লিমিটেডে প্রায় ৩২৮ কোটি টাকার সম্পদ অবশিষ্ট দেখানো হয়েছে, যা প্রকৃত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেডও একইভাবে প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতির কার্যকর আয়ুষ্কাল ৩০ বছর ধরে অবচয় হিসাব করছে। যদিও বিপিডিবির সঙ্গে চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ ১৫ বছর, তবুও ভবিষ্যতে চুক্তি নবায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি আয়ুষ্কাল ব্যবহার করা হয়েছে বলে ব্যবস্থাপনা পক্ষের দাবি। তবে নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, PPA অনুযায়ী প্রকৃত আয়ুষ্কাল ১৫ বছর হওয়ায় এই হিসাব পদ্ধতি আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শ্রম আইন মানার ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী গ্র্যাচুইটি এক্রুয়াল পদ্ধতিতে হিসাব করে দায় স্বীকার করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কর্ণফুলী পাওয়ার লিমিটেডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নগদ ভিত্তিতে গ্র্যাচুইটি পরিশোধের পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এতে প্রকৃত দায় কম দেখানো হয়েছে এবং মুনাফা ও সংরক্ষিত আয় বেশি দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। এছাড়া কোনো অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন না করায় আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড IAS 19 অনুযায়ী দায় নিরূপণেও অসামঞ্জস্য রয়েছে।
অন্যদিকে বারাকা শিকলবাহা পাওয়ার লিমিটেডে কোনো গ্র্যাচুইটি ব্যবস্থাই রাখা হয়নি, যা শ্রম আইন লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) গঠন না করার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন (BIPPA) সরকারের কাছে অব্যাহতির আবেদন করেছে- এই যুক্তিতে কোনো প্রভিশন রাখা হয়নি, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না থাকায় বিষয়টি কার্যত আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করছেন অডিট সংশ্লিষ্টরা।
কর সংক্রান্ত অনিয়মও অডিটে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বারাকা শিকলবাহা পাওয়ার লিমিটেড বাজারযোগ্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বিপরীতে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার স্থগিত কর সংরক্ষণ করেনি। কর ভিত্তি ও হিসাব ভিত্তির পার্থক্য বিবেচনায় এই সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক ছিল বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বাজারমূল্যের পরিবর্তে ক্রয়মূল্যে বিনিয়োগ দেখানো এবং প্রভিশন না রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড IAS 32-এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
লিজ দায় গোপনের অভিযোগও-
কর্ণফুলী পাওয়ার ও বারাকা শিকলবাহা পাওয়ার লিমিটেডের ক্ষেত্রে ট্যাংক ভাড়া চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট লিজ দায় আর্থিক বিবরণীতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যা IFRS 16-এর পরিপন্থী। এতে প্রকৃত দায় আড়াল হয়েছে বলে অডিট নিরীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি-
বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী সম্পদের নিবন্ধনপত্র (Fixed Asset Register) উপস্থাপন করা যায়নি। ফলে শত কোটি টাকার সম্পদের অস্তিত্ব ও প্রকৃত মূল্য নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু ক্ষেত্রে "Qualified Opinion" দেওয়া হয়েছে এবং "Emphasis of Matter" ও "Other Matter" অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে।
নিরীক্ষক আব্দুল্লাহ-আল-মাহমুদ এসব অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেডের চূড়ান্ত অডিট মতামত অপরিবর্তিত রেখেছেন। তবে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সংশোধিত মতামত দেওয়ায় পুরো গ্রুপের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেড ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপিডিবির সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় যথাক্রমে ৫০, ১০৫ ও ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০১৪ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।
রোলস রয়েস ইঞ্জিননির্ভর এই প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হলেও অডিটে উঠে আসা আর্থিক অসঙ্গতিগুলো এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে।
Comments