এক্সিম ও এসআইবিএল-কে বাদ রেখেই কি একীভূতকরণ?
পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়টি এত দীর্ঘায়িত হচ্ছে যে, এটি এখন অনন্তকালের অপেক্ষায় পরিণত হয়েছে ৭৬ লক্ষ গ্রাহকদের জন্য। এর মধ্যেই পাঁচ ব্যাংক মিলে যে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক হয়েছে, সেটি পথচলাই শুরু করতে পারেনি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও যোগ দেননি আর চেয়ারম্যানও সরে দাঁড়িয়েছেন।
সদ্য বিগত অন্তবর্তী সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় শরীয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক মিলে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আইটি ইন্টিগ্রেশনসহ একীভূতকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। এই পাঁচটি ব্যাংক হলো - এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন অনেকটা তড়িঘড়ি করে। বলা হয় এখানে ব্যাংকের অবস্থান বিবেচনার চেয়ে তার ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দও কাজ করেছে। বিশেষ করে এক্সিম ব্যাংকের বিষয়টি এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। জানা গেছে, এখানে কাজ করেছে, তার ব্যক্তিগত ক্ষোভ। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে দুর্বল চারটি ব্যাংকের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত সবল ব্যাংক এক্সিমকে মার্জ করা হয়েছিল। এক্সিম ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, নজরুল ইসলাম মজুমদার যখন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান ছিলেন তখন থেকেই মূলত: আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে দুজনের ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিল। তখন মনসুর ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এক্সিম ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মূলত ব্যক্তিগত রোষানলের কারণেই এক্সিম ব্যাংকটিকে মার্জ করা হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় চেয়েছিল কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় কারণটি পুরোটাই ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক্সিম ব্যাংকের মতো একটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যাংককে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। তার মতে, কোনো ব্যাংককে মার্জারে নেওয়ার আগে তার মূলধন কাঠামো, সম্পদের মান, আমানতকারীদের আস্থা এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্স গভীরভাবে মূল্যায়ন করা উচিত ছিল।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এখনও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক। নেই তারল্য সংকট, নেই নগদ জমা বা বিধিবদ্ধ জমার ঘাটতি। মূলধন ঘাটতিও নেই ব্যাংকটির। বড় অঙ্কের ঋণের বিপরীতে নিয়মানুযায়ী পর্যাপ্ত জামানত রয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, আহসান এইচ মনসুর শুধু তার জেদের কারণে পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করেছিলেন। ব্যাংকগুলোকে পঙ্গু করতে কর্মকর্তাদের বেতন ২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা এবং এর শেয়ার মূল্য শূন্য ঘোষণা করায় এ খাতের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও আমানতকারী উভয় পক্ষকেই বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষ ও কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব ছাড়েন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
এদিকে, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে অন্য পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছেন ব্যাংকটির ৯ জন শেয়ারধারী। চিঠিতে তাঁরা উল্লেখ করেন, ২০১৭ সাল থেকে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটি দখলের পর থেকে নানা অনিয়ম হয়েছে। তারা আরও বলেন, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলে এসআইবিএল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
দেশের ব্যাংক খাতে অন্তত আরও ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংক রয়েছে: যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে মূলধন ঘাটতির উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে ভুগছে। ওইসব ব্যাংককে পুনর্গঠন বা একীভূতকরণের আওতায় আনা হলে খাতের সার্বিক স্থিতিশীলতা বাড়ত। কিন্তু তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংককে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করায় বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
এসআইবিএল-কেও সুযোগ দিলে বিশেষ করে কিছু সহায়তা দিলে, ব্যাংকটি এলসি করার সুযোগ পেলে, যেসব সেবা প্রতিষ্ঠানের বিল সংগ্রহ করতো তা আবার শুরু করতে দিলে এই ব্যাংকটিও ঘুড়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন এর আসল উদ্যোক্তারা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আইটি ইন্টিগ্রেশনসহ একীভূতকরণ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। কিন্তু ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন সময় এসেছে নতুন করে ভাববার।
Comments