ইরানের অন্তরালের ক্ষমতাবান ব্যক্তি কে এই আলি লারিজানি?
আলি লারিজানিও বাঁচতে পারলেন না। হত্যা করেছে ইসরায়েল। তিনি ছিলেন ইরানের এমন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক, যিনি প্রকাশ্যে যতটা না দেখা যেতেন,তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতেন পর্দার আড়াল থেকে। দেশটির কৌশলগত সিদ্ধান্ত,বিশেষ করে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির ঘনিষ্ঠদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ বলয়ের একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন।
শুরুর জীবন ও উত্থান
লারিজানি ১৯৫৮ সালে নাজাফ-এ জন্মগ্রহণ করেন,যা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র। তার পরিবার ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। পরবর্তীতে তিনি ইরানে বড় হন এবং ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর দ্রুত ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে উঠে আসেন।
তিনি দর্শনে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকেও পরিচিত ছিলেন।
বহুমুখী দায়িত্ব ও প্রভাব
লারিজানি তার ক্যারিয়ারে নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি:
• ইসলামি রেভ্যিলুশনারি গার্ড কোর -এ দায়িত্ব পালন করেন (ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়)
• রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সংস্থার প্রধান ছিলেন
• জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ পদে কাজ করেন
• ২০০৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রায় সব স্তরে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ দেয়।
পারমাণবিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা
লারিজানি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন এবং একইসঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করেন।
২০১৫ সালের ইরানের পারমাণবিক চুক্তির প্রক্রিয়াতেও তার প্রভাব ছিল, যদিও তিনি সবসময় ইরানের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
"মধ্যপন্থী" কিন্তু কঠোর অবস্থান
লারিজানিকে অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী বা মধ্যপন্থী হিসেবে দেখা হলেও,তিনি কখনোই ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করেননি। বরং,প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নিতে দ্বিধা করেননি।
দেশের ভেতরে বিক্ষোভ দমন ও নিরাপত্তা কৌশলে তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সহিংস দমন-পীড়নে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষমতার ভেতরের মানুষ
লারিজানির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল-তিনি কখনো সামনের সারির জনপ্রিয় নেতা না হয়েও ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন একধরনের "ব্যাকরুম স্ট্র্যাটেজিস্ট",যিনি নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতেন কিন্তু সবসময় প্রকাশ্যে আসতেন না। তার পরিবারও ইরানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। তার ভাইয়েরাও উচ্চপদে ছিলেন,যা তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে।
মৃত্যু ও প্রভাব
তার মৃত্যুকে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ,তিনি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি নিরাপত্তা,কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে একসঙ্গে সমন্বয় করতে পারতেন। তার অনুপস্থিতি ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
Comments