যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় চাপে বাংলাদেশের ব্যক্তিখাত
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যক্তিখাত দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির বড় অংশই এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের ব্যক্তিখাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার পরিস্থিতি ব্যবসা–বাণিজ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
রাজনৈতিক টালমাটালে ব্যবসায় ধস
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন অস্থির ছিল। নানা ধরনের সহিংসতা, মব হামলা এবং প্রতিপক্ষকে দমন করার ঘটনাগুলো ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তোলে। অনেক উদ্যোক্তা নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকির কারণে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। বিভিন্ন এলাকায় কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটে, যার ফলে শত শত ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
এই পরিস্থিতি দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতকে বড় ধাক্কা দেয়। উৎপাদন কমে যায়, অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগের পরিবর্তে নিজেদের টিকে থাকার লড়াইয়ে মনোযোগ দিতে বাধ্য হন।
সংস্কারের নামে দীর্ঘ সময়
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতে বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এসব সংস্কারের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসতে পারেনি। ব্যাংকিং খাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
অনেক উদ্যোক্তা অভিযোগ করেন, সংস্কারের নামে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ছিলেন, ফলে বড় কোনো দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি। এতে ব্যক্তিখাতের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। বিনিযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
নির্বাচনের আশা ও নতুন উদ্বেগ
এই পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবসায়ী সমাজ আশা করেছিল যে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল সরকার ক্ষমতায় এলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও গতি পাবে। নতুন সরকার গঠনের পর ব্যক্তিখাতও কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই আশার মাঝেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আবারও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। এই সংঘাত ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ৬ শতাংশের আশেপাশে রয়েছে। জানুয়ারি মাসে এটি ছিল মাত্র ৬.০৩ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। টানা আট মাস ধরে এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে ব্যবসায়ীরা নতুন করে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা উদ্যোক্তাদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করছে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দামও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশটি প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল এবং প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস আমদানি করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে।
শিপিং খরচ ও ডলারের চাপ
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং খরচও বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকারকদের খরচ আরও বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প শুরু করার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
বিনিয়োগের নিম্নগতি
২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ কমে গেলে অর্থনীতির সামগ্রিক গতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও তখন দীর্ঘ সময় নেয়। ফলে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের ব্যক্তিখাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার জন্য কার্যকর নীতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, তেলের দাম বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উদ্যোক্তাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে দেশে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে গেছে এবং বিনিয়োগও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Comments