বাংলাদেশ কি পারবে সাশ্রয়ী জ্বালানি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে?
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। তবে সরকার বলছে, দেশে এখনো জ্বালানির প্রকৃত সংকট তৈরি হয়নি; বরং সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাস্তবতা হলো-সংকটের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভীতি ও বাজারের অনিশ্চয়তা।
সরকার ইতিমধ্যে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনেছে এবং বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানিকে উৎসাহ দিচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। আগে যেখানে প্রতি ইউনিট এলএনজি প্রায় ১০ ডলারে কেনা হতো, এখন তা ২৪-২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সরাসরি দেশের জ্বালানি ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সময়ে কাতার থেকে নির্ধারিত দুটি এলএনজি কার্গো না আসার খবর পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের প্রকৃত মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। গত চার দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এটি ইঙ্গিত করে যে অনেকেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় জ্বালানি মজুত করার চেষ্টা করছেন। এমন প্রবণতা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে, যা প্রকৃত সংকটের চেয়েও বিপজ্জনক।
এলপিজির ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণপত্র খোলার জটিলতা, যুদ্ধের কারণে জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে বাজারে দাম বেড়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৪১ টাকা হলেও অনেক জায়গায় ৫০০–৬০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্চ মাস পর্যন্ত বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই; প্রকৃত উদ্বেগ শুরু হতে পারে এপ্রিল থেকে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার গ্যাস, জ্বালানি তেল এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারে সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং এয়ারকন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা। এসব পদক্ষেপ সাময়িকভাবে চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর থাকায় সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেই তার প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় সরকারের আগাম প্রস্তুতি এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে একই সঙ্গে বাজারে আতঙ্ক বা গুজব ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও সমান জরুরি।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও অনেকেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করছেন। এর ফলে স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই এ ধরনের প্রবণতা বন্ধে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনগণকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, কারণ সংকটের সময়ে অযৌক্তিক মজুতদারি পুরো ব্যবস্থাকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এলপিজি বাজারের অনিশ্চয়তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেহেতু রান্নার কাজে এখন বিপুলসংখ্যক মানুষ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাই সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণ ও ঋণপত্র খোলার জটিলতা দ্রুত সমাধান করা গেলে আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে। পাশাপাশি সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায় বা সিন্ডিকেটের মতো অনিয়ম কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
তবে স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল নিয়েও এখনই ভাবতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এখনও বড় অংশে আমদানিনির্ভর, যা বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি-কে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি কিংবা অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে এমন সংকটের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্বালানি সাশ্রয়ের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে সামগ্রিকভাবে বড় সাশ্রয় সম্ভব। এটি শুধু সংকট মোকাবিলায় নয়, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নজরদারি এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে এর নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই আতঙ্ক নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাই হতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
Comments