যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনুস সরকারের বাণিজ্য চুক্তি, বিপদে বাংলাদেশ
অধ্যাপক ইউনুসের অন্তবর্তী সরকার গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাড়াহুড়ো করে আমেরিকার সাথে যে বানিজ্যিক চুক্তি করে গেছে তার মাশুল গুনতে হবে অনেকদিন যদি না এই চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা না যায়। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিশ্চয়ই এখন সময় চাইবে, কারণ পরিস্থিতি খোদ আমেরিকাতেই বদলে গেছে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি সই করে। উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য শুল্কঝড় থেকে রক্ষা পাওয়া। কিন্তু ১১ দিনের মাথায় পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেরশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপে আইনসম্মতভাবে কাজ করেনি। এক ঝটকায় দুর্বল হয়ে পড়ে চুক্তির আইনি ভিত্তি। ফলে বাংলাদেশের আন্তবর্তী সরকারের ৯ ফেব্রুয়ারির সিদ্ধান্ত যে দূরদর্শিতা ছিল না, বরং কৌশলগত ভুল ছিল তা এখন প্রমা্ণিত।
নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এখন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মোহাম্মদ ইউনুসের সময় সই হওয়া এই চুক্তিতে রয়েছে বড় অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি, যেগুলোর অনেকগুলোই পালন করা বাংলাদেশের জন্য একেবারে সম্ভব নয়। আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে কে এখন ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে কেন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে শুল্কনীতি নিয়ে প্রশ্ন চলমান থাকা সত্ত্বেও এত দ্রুত অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার সম্ভাব্য শুল্ক আঘাত ও একতরফা মার্কিন বাণিজ্য ব্যবস্থার আশঙ্কায় "নিরাপদ আশ্রয়" খুঁজতে চেয়েছিল। কিন্তু শক্তিশালী অংশীদারের সঙ্গে আলোচনায় তাড়াহুড়া প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ শুল্ক নয়, বরং অশুল্ক শর্তগুলো। কিছু ধারা বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্য সহযোগিতা বা নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে পারমাণবিক অংশীদারত্বে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে-যা সরাসরি পররাষ্ট্রনীতির নমনীয়তাকে সংকুচিত করে।
চুক্তিতে রয়েছে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ক্রয়, ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা এবং ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির অঙ্গীকার। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এসব প্রতিশ্রুতি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। তুলনায় সম্ভাব্য মার্কিন গড় শুল্কহার যদি ১১.৪ শতাংশের আশেপাশে থাকে, তবে বাংলাদেশ যে মূল্য পরিশোধে রাজি হয়েছে তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পোশাক খাত সাময়িক স্বস্তি পেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বাতিল হলেও হোয়াইট হাউস বৈশ্বিক শুল্কের ভিত্তি ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
হঠাৎ করে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, আবার অন্ধভাবে এগোলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা বাড়বে। তাই বিশ্লেষকদের পরামর্শ- মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ভিত্তি করে একটি "কারিগরি বিরতি" বা টেকনিক্যাল রিভিউ চাওয়া যেতে পারে। এতে বিষয়টি রাজনৈতিক সংঘাতের বদলে আইনি পর্যালোচনার ভাষায় তোলা সম্ভব হবে।
ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য সতর্ক কৌশল নিয়েছে, মালয়েশিয়া সবকিছু স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। বড় অর্থনীতি যেমন ভারত ও দক্ষিণ কোরিযা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কেউই তাড়াহুড়ো করছে না।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার-৯ ফেব্রুয়ারির তাড়াহুড়া আর ফেরানো যাবে না, কিন্তু পরবর্তী ভুল এড়ানো এখনো সম্ভব। সময় একবার হারালে ফিরে পাওয়া যায় না, তবে কৌশলে ব্যবস্থাপনা করা যায়। এখন ঢাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সেটিই।
Comments