সম্প্রচার মাধ্যমে ভাষার ব্যবহার: শুদ্ধতা, সহজতা ও দায়িত্ব
প্রয়াত অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর 'ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী' শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলা ভাষার বর্তমান ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানসিকতার ধারক। তাই ভাষার অবক্ষয় মানে কেবল শব্দের বিকৃতি নয়, বরং সাংস্কৃতিক ভিত্তির দুর্বল হয়ে পড়া। তাঁর মতে, ভাষাদূষণ প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট, উচ্চারণে এবং শব্দ ব্যবহারে। বিশেষ করে গণমাধ্যমে বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা, কৃত্রিম টান সৃষ্টি করা এবং অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দ প্রয়োগ-এসব প্রবণতা ভাষার স্বাভাবিক রূপকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে সম্প্রচার মাধ্যমের ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার-বেতার বা টেলিভিশনের ভাষা সাহিত্যিক ভাষা নয়। যে ভাষায় কবিতা রচিত হয়, যে ভাষায় দীর্ঘ প্রবন্ধ বা গবেষণাপত্র লেখা হয়, সেই জটিল ও অলংকারসমৃদ্ধ ভাষা সম্প্রচার মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় না। কারণ গণমাধ্যমের প্রধান লক্ষ্য হলো দ্রুত, সহজ ও বোধগম্যভাবে তথ্য পৌঁছে দেওয়া। দর্শক বা শ্রোতা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও শিক্ষাগত পটভূমি থেকে আসেন; তাই ভাষা হতে হবে সর্বজনগ্রাহ্য। সহজ করে বলা মানে ভাষার শুদ্ধতা বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং ব্যাকরণসম্মত, প্রমিত ও প্রাঞ্জল ভাষাকে আলাপচারিতার ভঙ্গিতে উপস্থাপন করাই হলো সম্প্রচার সাংবাদিকতার মূল চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের সম্প্রচার জগতে গত দুই দশকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন ও বেতারই ছিল প্রধান মাধ্যম। পরবর্তীকালে বেসরকারি টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সম্প্রচার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটে। বর্তমানে চল্লিশটির মতো বেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অসংখ্য এফএম রেডিও সক্রিয়। শুধু দেশেই নয়, প্রবাসেও বাংলা চ্যানেল সম্প্রচারিত হচ্ছে। আর আছে অসংখ্য অনলাইন ও তাদের ইউটিউব চ্যানেল যারাও সংবাদ সম্প্রচার করছে। এই বিস্তৃত পরিসরে ভাষার ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ গণমাধ্যম এখন কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
বিশ্বায়ন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ফলে প্রতিনিয়ত নতুন বিদেশি শব্দ আমাদের ভাষায় প্রবেশ করছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতি বা বিনোদন-সব ক্ষেত্রেই ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব শব্দের কিছু গ্রহণ করা অনিবার্য, কারণ নতুন ধারণা বা প্রযুক্তির উপযুক্ত বাংলা প্রতিশব্দ অনেক সময় প্রচলিত নেই। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলা বাক্যের মধ্যে ইংরেজি শব্দ জুড়ে দেওয়া হয় কিংবা বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি শব্দ ব্যবহারে আগ্রহ দেখা যায়। এতে ভাষার স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয় এবং একটি শঙ্কর ভাষার উদ্ভব ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করে।
সম্প্রচার মাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাৎক্ষণিকতা। সংবাদ উপস্থাপন, সরাসরি অনুষ্ঠান পরিচালনা বা আলোচনা-সবকিছুই দ্রুততার সঙ্গে করতে হয়। এই দ্রুততার কারণে উচ্চারণে শৈথিল্য, বাক্যগঠনে ভুল বা শব্দচয়নে অসতর্কতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কিছু এফএম রেডিও উপস্থাপকের কৃত্রিম উচ্চারণভঙ্গি ও টান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ইউটিউবেও একই অবস্থা। তারা হয়তো এটিকে আধুনিক নাগরিক ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, কিন্তু প্রশ্ন হলো-এটি কি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন, নাকি সচেতনভাবে তৈরি করা এক ধরনের কৃত্রিম রীতি? ভাষা অবশ্যই সময়ের সঙ্গে বদলাবে, কিন্তু সেই পরিবর্তন হওয়া উচিত স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাকৃতিক; আরোপিত বা অনুকরণমূলক নয়।
গণমাধ্যমের প্রভাব ব্যাপক। টেলিভিশন, রেডিও বা অনলাইন সম্প্রচার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। ফলে সেখানে ব্যবহৃত ভাষা দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কথাবার্তায় প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞাপন ও কিছু কমেডি নাটকে প্রমিত, আঞ্চলিক ও বিদেশি শব্দের অপরিকল্পিত মিশ্রণ প্রায়ই শোনা যায়। কখনো কখনো অশুদ্ধ উচ্চারণকে ইচ্ছাকৃতভাবে হাস্যরসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বারবার এমন ব্যবহার ভাষার মানকে নিচে নামিয়ে আনে এবং শুদ্ধ ভাষাচর্চাকে নিরুৎসাহিত করে।
তাই প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ কেউ ভাষানীতির কথা বলেন, যা সম্প্রচার মাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের জন্য দিকনির্দেশনা দেবে। কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সচেতনতা ও প্রশিক্ষণই এখানে বেশি কার্যকর হতে পারে। উপস্থাপক, সংবাদ পাঠক ও স্ক্রিপ্ট রচয়িতাদের জন্য প্রমিত উচ্চারণ ও ভাষার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে নতুন বিদেশি শব্দ গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিবেচনা ও সংযম থাকা দরকার।
আমরা অবশ্যই বিদেশি ভাষা শিখব, বিশ্বসংযোগ বাড়াব এবং নতুন জ্ঞান আহরণ করব। কিন্তু মাতৃভাষা বাংলা আমাদের চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রধান বাহন। ভাষার সৌন্দর্য ও শুদ্ধতা রক্ষা করা মানে অতীতকে আঁকড়ে ধরা নয়; বরং সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা। সম্প্রচার মাধ্যম যেহেতু জনমানসে দ্রুত প্রভাব ফেলে, তাই এখানে ভাষার ব্যবহার হওয়া উচিত সহজ, প্রাঞ্জল, ব্যাকরণসম্মত ও প্রমিত। শুদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই—এই উপলব্ধি থেকেই গণমাধ্যমকে এগোতে হবে। তাহলেই ভাষা যেমন সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাবে, তেমনি তার স্বকীয়তা ও সৌন্দর্যও অটুট থাকবে।
Comments