সরকার কি আদৌ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করতে পারবে?—প্রশ্ন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের
বর্তমান সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে কি না—সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
দেশের গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথাকথিত 'নতুন বন্দোবস্ত' বাস্তবায়নে গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, "বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আদৌ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কি না, তা এখন স্পষ্টভাবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।"
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) নাগরিক সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, "নতুন বন্দোবস্ত নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটেনি—এ কথা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বীকার করেছে।"
নতুন বন্দোবস্ত নিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, "সংস্কারের নামে মূলত উপরি কাঠামোর ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংশোধন, শাসনতান্ত্রিক ভারসাম্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ বদলের কথা বলা হলেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত না করলে এসব কাঠামো টেকসই হয় না।"
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু সেগুলো টেকেনি। কারণ এসব পরিবর্তনের পক্ষে থাকা সামাজিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত করা হয়নি।"
ড. দেবপ্রিয়ের মতে, নতুন বন্দোবস্তের দাবিদাররাই শেষ পর্যন্ত পুরনো বন্দোবস্তের অংশ হয়ে পড়েছেন এবং ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। এতে পুরনো কায়েমি স্বার্থ আবার শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছে।
তিনি বলেন, "ব্যবসায়ীরা পালালেও, রাজনীতিবিদরা আত্মগোপনে গেলেও আমলাতন্ত্র ফিরে এসেছে, কারণ পুরনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক এই আমলাতন্ত্র।"
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই আমলাতন্ত্রের এই পুনরুত্থানে সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, "সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য যে সক্ষমতা, অংশীজনের অংশগ্রহণ ও উন্মুক্ততা প্রয়োজন ছিল, সরকার তা দেখাতে পারেনি। বরং শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এর ফলে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।"
"এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই সরকার কি আদৌ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে?" বলেন তিনি।
গণমাধ্যম প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, অতীতে গঠিত মিডিয়া কমিশনের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয়নি। কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল মিডিয়া হাউসগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, "যে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিজের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না, তার অন্যের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করার নৈতিক অধিকারও সীমিত হয়ে যায়।"
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের পেশাজীবী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে স্বাধীন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
"মিডিয়া যদি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত থাকে, তাহলে তাদের কণ্ঠস্বরের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং তারা পেশাগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না," বলেন তিনি।
মিডিয়া হাউসের ভেতরে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের পেশাগত উৎকর্ষ, ন্যায্য মজুরি, প্রণোদনা ও কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, গণতন্ত্র না থাকলে এবং মালিকপক্ষ যদি লুটপাটতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থে মিডিয়ার স্বাধীনতা প্রত্যাশা করা 'সোনার পাথরবাটি' কল্পনার মতো।
তিনি বলেন, কেবল উপরি কাঠামো বদলে নতুন বন্দোবস্ত সম্ভব নয়। এর পক্ষে থাকা শক্তিকে সংগঠিত করতে হবে, নতুন রাজনীতির চর্চা গড়ে তুলতে হবে এবং কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকতে হবে। নাগরিক সমাজকেও নিজেদের ভূমিকার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আগামী দিনে আরও সক্রিয় ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
"এই অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়েই আগামী দিনে সত্যিকারের বন্দোবস্ত পরিবর্তনের পথে এগোতে হবে," বলেন ড. দেবপ্রিয়।
Comments