ক্ষমতার খেলায় ভেনেজুয়েলা: সরকার, সেনা ও বিদেশি প্রভাব
ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষমতা ধরে রেখেছে। অনুগতদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সমর্থনে এই গোষ্ঠী দেশটির শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতাচ্যুত করার পরও এই ক্ষমতার কাঠামো অটুট রয়েছে।
মাদুরোকে যখন মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে নিউইয়র্কে আটক রাখা হয়, ঠিক তখনই তার উত্তরসূরি অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে শপথ নেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কারা? আর দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কোন মার্কিন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন?
দেলসি রদ্রিগেজ
রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট। তিনি মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দীর্ঘদিনের শাসক দলের সদস্য। কেন গুরুত্বপূর্ণ তিনি? কারণ, এক সময় তিনি অর্থমন্ত্রী, তেলমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকায় দেশীয় অর্থনীতি ও শক্তির মালিকানায় প্রভাবশালী ছিলেন। মার্কিন সরকার আপাতত তাঁকে বিশ্বাস করছে এবং তিনি দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত তেল খাত পুনরুদ্ধারে বিদেশি কম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজও করতে পারেন বলে দেখা হচ্ছে।
জর্জে রদ্রিগেজ
জর্জে রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ভাই এবং ভেনেজুয়েলার জাতীয় সংসদের স্পিকার বা সভাপতি। ২০২১ সাল থেকে তিনি এই দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি এমন একটি সংসদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
জর্জে রদ্রিগেজ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশের রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে মাদুরো সরকারের যোগাযোগ ও আলোচনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অতীতে নির্বাচন আয়োজনের শর্ত নির্ধারণ এবং বন্দিমুক্তি নিয়ে হওয়া বিভিন্ন আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ওয়াশিংটন ও কারাকাসের সূত্রগুলোর মতে, তার বোন দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে একত্রে তাকে বিদেশি সরকারগুলোর কাছে একজন যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য আলোচক হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, বিদেশি কম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে তেল খাতের আইন সংশোধনের উদ্যোগে তিনিই নেতৃত্ব দেবেন
ডিওসদাদো কাবেইয়ো
কাবেইয়ো ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী। কাবেইয়ো দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিসিআইএম এবং শাসক দলের সহযোগী মোটরসাইকেল গ্যাং কোলেক্তিভোস‑এর ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রাখেন, যারা বিরোধীদের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য পরিচিত।
কাবেইয়োকে দেশের অপরাধ দমন ও দমন নীতির প্রধান প্রয়োগকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি 'চাভিজমো' রাজনৈতিক ধারার এক প্রধান নেতাও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে নরকোটেররিজমসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেচেন। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার রাখা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, যদি তিনি রদ্রিগেজদের সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, তবে তাকে গ্রেপ্তারের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে দেখা হতে পারে।
ভ্লাদিমির পাদ্রিনো
পাদ্রিনো ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। তিনি দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ড পালন করেন, যা মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা বা ক্ষমতার শূন্যস্থান রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাদ্রিনো কাবেইয়োর তুলনায় কম কঠোর নীতি অনুসরণ করেন এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছেন। তাকে মার্কিন নরকোটেররিজম ঘটনার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং তার গ্রেপ্তারের জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে, যদিও তিনি দীর্ঘ ১১ বছর ধরে একই পদে থাকছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, পাদ্রিনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন এবং নিরাপদভাবে তাদের সামরিক ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে নিতে পারেন।
মারিয়া করিনা মাচাদো
মারিয়া করিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলার প্রধান বিরোধী নেত্রী এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। তিনি দীর্ঘ সময় যাবৎ শাসক দলের বিরুদ্ধ মনোভাব নিয়ে মাদুরো সরকারের দমন এবং অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন, যার জন্য বর্তমান সরকার তাকে দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে।
মাচাদো ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের প্রাথমিক নির্বাচনে ব্যাপক সমর্থন জিতেছিলেন, কিন্তু পরে মাদুরো সরকারের আদেশে তাঁকে মূল নির্বাচনে দাঁড়াতে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। যদিও তিনি সরকারের কিছু সদস্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রাখেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তিনি দেশ চালানোর যোগ্যতার জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সমর্থন নেই।
মার্কো রুবিও
রুবিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কর্তব্যরত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত প্রধান মুখ হিসেবে তিনি কাজ করছেন এবং মার্কিন নেতৃত্বকে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাদের নির্দেশ অনুসরণে চাপ প্রয়োগে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। কিউবান-আমেরিকান ও স্প্যানিশ ভাষায় পারদর্শী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন থেকে ল্যাটিন আমেরিকার ব্যাপারে আগ্রহী।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা তার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল এবং তিনি বলেছেন, পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে কিউবান সরকারের বিরুদ্ধেও কাজ করতে চান। তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন যাতে ভেনেজুয়েলা মার্কিন স্বার্থ অনুসারে কাজ করে।
জন র্যাটক্লিফ
জন র্যাটক্লিফ মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)‑এর পরিচালক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান গোয়েন্দা সংগঠনের নেতৃত্ব দেন এবং কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার ওপর কাজ করা কোর টিমের অংশ।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী র্যাটক্লিফ প্রায় প্রতিদিন ভেনেজুয়েলা টিমের নেতৃত্ব বৈঠক ও কলগুলোতে অংশ নেন, যেখানে রুবিও, হোয়াইট হাউস সহকারী স্টিফেন মিলার এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ থাকেন।
সূত্র বলেছে, মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা থেকে বের করে আনার অপারেশনে সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা আগস্ট থেকে মাঠে একটি ছোট দল রাখে, যারা তার অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট করে অপারেশন বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়।
স্টিফেন মিলার
স্টিফেন মিলার হোয়াইট হাউসের নীতি বিষয়ক ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। মিলার হোয়াইট হাউসের নীতিগত সিদ্ধান্ত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং প্রেসিডেন্টের প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণে তিনি ব্যাপক প্রভাব রাখেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন ও নিরাপত্তা নীতির প্রধান স্থপতি তিনি, এবং মার্কিন সরকারের ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত নীতি ও পদক্ষেপগুলিতে তার প্রভাব লক্ষ্য করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত কাজেও তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
পিট হেগসেথ
তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব। হেগসেথ বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ক্যারিবিয়ান এলাকায় ব্যাপক মার্কিন সামরিক শক্তি মোতায়েন এবং সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌকাগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত অভিযানে তার বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং যদি বর্তমান সরকার মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা না করে, তিনি আরো সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিতে পারেন।
ক্রিস রাইট
ক্রিস রাইট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি সেক্রেটারি বা শক্তি সচিব। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি নীতি ও প্রশাসনের দায়িত্বে আছেন, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ তেল শিল্প ও তেলবাণিজ্য সম্পর্কিত কাজও রয়েছে। রাইট ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প পুনর্গঠনে।
তিনি বলেছেন, দেশটির তেল উৎপাদন পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে মার্কিন বড় তেল কম্পানি যেমন শেভরন তাদের কার্যক্রম বাড়াতে পারে এবং কনোকোফিলিপস এবং এক্সনমোবিল (যারা বহু সময় ধরে ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় ছিল না) সেখানে ফিরে আসতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে চীনের একটি ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র হতে দেবে না, যদিও তেলের বিক্রয় চীনের সঙ্গে চলতে দেওয়া হয়েছে।
Comments