যুদ্ধের মাঠে নয়, রুটির লাইনে ইরানের পরাজয়
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান সামরিকভাবে পরাজিত হয়নি - এমন দাবিই তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর। বরং পাল্টা হামলা,আঞ্চলিক প্রভাব এবং 'প্রতিরোধের অক্ষ'-এ নেতৃত্ব দেওয়ার গল্পে রাষ্ট্র নিজেকে বিজয়ীর আসনে বসাতে চেয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ধোঁয়া কাটতেই স্পষ্ট হচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা: ইরান হয়তো বাইরের শত্রুর কাছে হারেনি,কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেকেই হারাচ্ছে।
আজ ইরানের রাস্তায় রাস্তায় যে মিছিল,বিক্ষোভ আর ক্ষোভ - তা কোনো বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল নয়,বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অর্থনৈতিক ব্যর্থতার বিস্ফোরণ। ২০২২ সালে মাহসা জিনা আমিনির মৃত্যুর পর যেমন দেশ কেঁপে উঠেছিল,তার পর এই আন্দোলনই সবচেয়ে বড়। এবার বিক্ষোভে শুধু তরুণ বা নারীরা নয়,ব্যবসায়ী,দোকানদার,শ্রমজীবী মানুষ - সবাই।
এর মূল কারণ অর্থনীতি। ডিসেম্বরে ইরানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৪২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এক ডলারের দাম গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ১৪ লক্ষ রিয়েলে। খাদ্যের দাম এক বছরে বেড়েছে ৭২ শতাংশ,স্বাস্থ্যসামগ্রীর দাম ৫০ শতাংশের বেশি। মাংস এখন বহু পরিবারের কাছে বিলাসপণ্য। মৌলিক খাবার জোগাড় করাই সংগ্রাম।
দারিদ্র্য ও বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অপুষ্টিতে ভুগছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে। তরুণদের বড় অংশ কর্মহীন। যে সমাজে ভবিষ্যৎ নেই,সেখানে ক্ষোভ অনিবার্য।
এই সংকট শুধু নিষেধাজ্ঞার ফল - এমন ব্যাখ্যা শাসকগোষ্ঠী দিতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। বিশাল তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি দুর্বল,কারণ রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার জনগণ নয়। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার চলছে ঋণের ওপর। দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া মন্ত্রী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু করে ফেলেছেন।
আন্তর্জাতিকভাবে ইরান আজ প্রায় একঘরে। রাশিয়া ছাড়া বড় শক্তির সমর্থন নেই বললেই চলে। পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের কারণে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বিনিয়োগ,বাণিজ্য ও মুদ্রাকে ধ্বংস করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আঞ্চলিক সংঘাতের অনিশ্চয়তা।
তবে সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক ও আদর্শগত। জনগণের কল্যাণের চেয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার,সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং কট্টর ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী বিদ্বেষী,দমনমূলক এই শাসনব্যবস্থায় পুরো সমাজ যেন এক অদৃশ্য কারাগার। নাগরিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত,জীবনের মান অবনতিশীল।
ফলে আজ প্রশ্ন উঠছে - ইরান কি সত্যিই বিজয়ী? যুদ্ধ জেতার বাসনায় রাষ্ট্র হয়তো বাহ্যিকভাবে শক্তি দেখাতে পেরেছে,কিন্তু সেই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় পরাজয় ঘটেছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়। আর সেই পরাজয়ের বোঝা বইছে সাধারণ মানুষ।
ইতিহাস বলে,কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন নিজের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। বন্দুক ও বোমা দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায়,কিন্তু ক্ষুধা,বেকারত্ব আর অপমানের বিরুদ্ধে নয়। ইরানের সামনে আজ সেই কঠিন সত্যই উন্মোচিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় আয়াতুল্লাহ খামেনির দীর্ঘ শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে যে শাসনব্যবস্থা ধর্মীয় বৈধতা,নিরাপত্তা বাহিনী ও বিপ্লবী বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে,তা এখন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে। আদর্শ দিয়ে কিছু সময় জনতাকে বোঝানো গেলেও পেটের ক্ষুধা দীর্ঘদিন চুপ করিয়ে রাখা যায় না - ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ।
রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এখনো 'প্রতিরোধ','শত্রুর ষড়যন্ত্র' আর 'জাতীয় মর্যাদা' রক্ষার গল্প শোনায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই ভাষা ক্রমেই অর্থহীন হয়ে উঠছে। কারণ মর্যাদা দিয়ে বাজারের থলি ভরে না,বিপ্লবী স্লোগানে সন্তানের চিকিৎসা হয় না। মানুষ আজ প্রশ্ন করছে - লেবানন, সিরিয়া বা ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তারের অর্থ যদি ঘরের ভেতর ক্ষুধা বাড়ায়,তবে সেই নীতির মূল্য কী?
এই বিক্ষোভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক বিস্তৃতি। আগে ইরানে প্রতিবাদ মানেই ছিল শহুরে তরুণ বা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। এবার সেই গণ্ডি পেরিয়ে ছোট ব্যবসায়ী,বাজারের দোকানদার,এমনকি ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল শ্রেণিও অসন্তোষ প্রকাশ করছে। এটি শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি সতর্ক সংকেত,কারণ ঐতিহ্যগত সমর্থনভিত্তিই ধীরে ধীরে নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র কঠোর দমননীতির পথেই হাঁটছে। গ্রেপ্তার,ভয়ভীতি আর সেন্সরশিপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট সমাধান না করে কেবল নিরাপত্তা দিয়ে স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখা কঠিন। বরং এতে ক্ষোভ আরও গভীরে জমছে।
ইরানের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে কট্টরবাদিতা,বিচ্ছিন্নতা ও সামরিক অগ্রাধিকারের পুরোনো রাস্তা,যা দেশকে আরও দুর্বল করবে। অন্যদিকে রয়েছে সংস্কার,আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও জনগণকেন্দ্রিক অর্থনীতির কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পথ। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে,তা শুধু শাসকদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয় - ইরানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্যও সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আজ তাই ইরানের সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়,এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষাও। যুদ্ধের মাঠে জয় দাবি করা রাষ্ট্রটি যদি নিজের জনগণের আস্থা হারায়,তবে সেই জয় শেষ পর্যন্ত অর্থহীনই থেকে যাবে।
Comments